বুধবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৪

রহনপুর- স্বর্গছেঁড়া গ্রাম

(ভূমিকা: রহনপুর আমার জন্মস্থান। সেখানেই বেড়ে ওঠা, বিকশিত হওয়া। এই রহনপুর থেকে এখন দূরে আছি। ফলে রহনপুর স্মৃতি হয়ে, মাঝে মাঝে পরাবাস্তব হয়ে আমাকে তাড়িত করে। এই তাড়নার সময় একধরনের বিভ্রম হয়, আমি ঠাওর করতে পারি না আমি কোথায় আছি... তখন রহনপুরেরর নানা টুকরো গল্প, নানা চরিত্র চোখের সামনে চলে আসে। এরা যে আসে এবং চলে যায়, এই চলে যাওয়ায় লাগাম লাগাতে এই লেখা।)


স্টুডিও রূপছায়া ও ছবিতোলা



তখন ছবি তুলতে যাওয়া ছিলো এক উৎসবের বিষয়।
যেদিন ছবি তুলতে যাওয়া হবে সেদিন নদীতে দাপাদাপি কম।চোখ যেন লাল হয়ে না যায়। তারপর বেশ গুছিয়ে সাবান-টাবান মাখা। পা ছবিতে আসবে না বলে পা-কে কম গুরুত্ব দেয়া। চুলে খুব করে ফেনা ঘষা। সাবানেরই ফেনা- শ্যাম্পু তখনও নাগালের বাইরের জিনিস।

বিকেলে চুল পাট করে আঁচড়িয়ে, সবচেয়ে নতুন শার্টটা পরে, গলায় ভালো করে পাওডার ঘষে ছবি তুলতে যাওয়া হতো। পাসপোর্ট সাইজ সাদাকালো। ইস্কুলে লাগবে দুই কপি। দুই কপি এক্সট্রা- আর একটা নেগেটিভ। নেগেটিভটা খুব যত্ন করে রাখতে হতো। এ্যালবামে অন্য ছবির ভিতরে নেগেটিভগুলো সাধারণত চিপকাচিপকি হয়ে থাকতো।

ছবি তুলতে শৈশবের মথুরা ছিলো- স্টুডিও রূপছায়া।
ঝা চকচকে স্টুডিও। কাচের দরজা। ভিতরে একপাশে রিশেপশন, অন্যপাশে সোফা। সোফার পেছনে এ্যাকুইরিয়াম। এ্যাকুইরিয়ামে রঙিন মাছ। অবশ্য এ্যাকুইরিয়ামের আমদানি আরো পড়ে। কিন্তু অবস্থা এরকম ছিলো। ফলে স্টুডিওর ভিতরে ঢুকতে আমাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে আসতো। এতো জেল্লা সহ্য করার মতো অবস্থা তখন ছিলো না।

আর রূপছায়ার কর্ণধার টুলু ভাই যেন নিজেই বিজ্ঞাপন। নায়কসুলভ চুল, ক্লিনশেভ, জিনস-ফুলহাতা চটকদার শার্ট- তাকে দেখলেই ঢাকাই ফিল্ম থেকে মন একলাফে মুম্বাই চলে যেতো। টুলু ভাই বলতেনও সুন্দর। আমরা ঢিবিঢিবি বুক নিয়ে যখন স্টুডিওর ভিতরে ঢুকতাম, প্রায়শ শুনতাম টুলু ভাই ভিতরে আছেন।

ভিতরে আছেন মানে ছবি তুলছেন। আমাদের তখন রিসেপশনের কাচের টেবিলে অন্যদের তুলে রাখা ছবি দেখে দেখে সময় কাটাতে হতো। আমরা বুঝতাম সৌভাগ্যবানদের ছবি এখানে স্থান পায়। আমাদের খুব ঈর্ষা হতো।

তারপর একসময় আমাদের ডাক আসতো।
চারদিক থেকে চারটা তীব্র লাইট এসে পড়েছে বেঞ্চের যে-জায়গায় সেখানে বসতে হতো। টুলু ভাইয়ের ক্যামেরা স্ট্যানগানের মতো উদ্যত আমার দিকে। একবার শুধু বলতাম, পাসপোর্ট...

ঘাম হতো। টুলু ভাই টিস্যু দেখিয়ে দিতেন।
বুকে প্রচণ্ড জোরে কেউ যেন হাতুড়ি পেটাতো। মনে হতো হার্টফেল হয়ে যাবে। শরীর শক্ত করে বসে থাকতাম।

টুলু ভাই এগিয়ে এসে ঘাড়টা ঠিক করে দিতেন। কিন্তু ক্যামেরার কাছে ফিরে যেতে যেতেই আমার ঘাড় আবার স্থানচ্যুত হতো। মনে মনে নিজেকে খুব গালি দিতাম। কিন্তু শরীরের মাংসপেশীগুলো কখনোই ঢিলে হতো না।

টুলু ভাই বলতো, একটু হাসো...
হাসতে গিয়ে মনে হতো জীবন দিয়ে দিচ্ছি। কোনোমতেই হাসিটা নিয়মমতো খেলাতে পারছি না ঠোঁটে। ঠোঁটটা বরং অদ্ভুতভাবে ফুলে উঠছে।

টুলু ভাই আবার আসতেন। ঘাড় আবার ঠিক করে দিতেন। বলতেন, সহজ হও।
এখন এ অবস্থায় সহজ হই কী করে?
ফলে অ-সহজ মানুষ হয়েই ট্যারা চোখে তাকিয়ে থাকতাম ক্যামেরার দিকে।

'রেডি...একটু হাসি' বলেই টুলু ভাই শাটার টিপতেন। চোখ ঝলসে যেতো আলোয়। ছবি তোলার যুদ্ধ শেষ হতো। এবার শুরু হতো অন্যরকম যুদ্ধ। যুদ্ধটা অপেক্ষার। চারদিন পরে ছবি পাবো। কিন্তু ছবিটা কেমন হবে? গতবার যেমন বান্দর বান্দর লাগছিলো নিজেকে তেমনি কি লাগবে? ইত্যাদি নানারকম ভাবনায় চারটা দিন ঠিক করে ঘুম হতো না। পেট পর্যন্ত নেমে যেতো।

চতুর্থ দিন রশিদ দেখিয়ে ছবি নিয়ে আসতাম। প্রথমে একবার দেখে নেয়ার পর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম। বোঝার চেষ্টা করতাম ছবিটা নিজেরই কিনা! কান দুটো আরো লম্বা দেখাচ্ছে কিনা! সদ্য গজানো লোম লোম গোঁফগুলো বাজে লাগছে কিনা!

তো একটা ছবি তোলা মানে সপ্তাহখানেকের বিশেষ পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে যাওয়া ছিলো। তবে এখন ছবি তোলা অনেক অনেক সহজ ব্যাপার। এই তো যে-বস্তুটায় লিখছি তাতেই একটা ক্যামেরা আছে। সামনে একটা মোবাইল অযতনে পড়ে আছে, তাতেও একটা ক্যামেরা বিদ্যমান। একটা ক্যামেরা ড্রয়ারবন্দি। চারদিকে ক্যামেরা আর ক্যামেরা। অথচ এত ক্যামেরার মথ্যেও আমি এখনও সাবলীল হতে পারি নি- এখনো ক্যামেরাকে আমার পিস্তল বা স্টেনগান বা মর্টার মনে হয়। আমার ঘাড়ের রগ শক্ত হয়ে যায়। ঠোঁটের মাংসপেশী স্বাভাবিকত্ব হারায়।
কানের কাছে কেউ যেন বলে, সহজ হও। সহজ হও...

আমি অ-সহজ মানুষ সহজ হই কী করে?





মুচিরাজ কমলা


রহনপুরে, আমাদের কালে এক মুচি ছিলো।
মুচির নাম কমলা মুচি। আমরা তখন ছোট। স্যান্ডেল হাতে ধরে বাজারে নিয়ে গিয়ে সেলাই করাতে তখনো আমাদের প্রেস্টিজে লাগে না। ফলে বাড়ির সকলের ছেঁড়া জুতা-স্যান্ডেল আমাদের কাঁধে চাপে। আমরা পলিথিনযোগে হাতে স্যান্ডেল ঝুলিয়ে বাজার যেতাম। বাড়ি থেকে কড়া ইন্সট্রাকশন থাকতো, সেলাই করাতে হবে কমলার কাছে।

তবে, জ্ঞানের অভাবে, আমরা মুচিকে তখন চামার বলতাম। কেন বলতাম, কে জানে? তারা চামড়া জুতাস্যান্ডেলের মেরামতকারী বলে কি?

চামারেরা, জ্ঞানের মুচিরা, বাজারের একপাশ থেকে সারি সারি বসতো। কমলার নাম ছাড়া কারো নাম জানতাম না। জানার প্রয়োজনও ছিলো না। আমাদের জুতোস্যান্ডেলের উদ্দেশ্য, গন্তব্য, প্রতিগন্তব্য সবই ছিলো ওই কমলা।

কমলা নাম শুনে যারা ভ্রু কুচকে ফেলছেন, তাদের জন্য বলি কমলা পুরুষ মানুষ; একটু বয়ষ্ক আর গরীব বলে তাকে ঠিক পুরুষ দেখাতো না, খুব ভালো করে না দেখলে মানুষও মনে হতো না মাঝে মাঝে।
একটা চটের বস্তা- যাকে আমরা ছালা বলতাম, তারোপর বসে, একটা ভাঙা কাঠের বাক্স ও লোহার এক অদ্ভুত খণ্ড নিয়ে তার কারবার চলতো। জুতো স্যান্ডল সেলাই করে, আঙুলের ডগায় মোটা সুইয়ের আঘাত খেয়ে খেয়ে আঙুলের ডগাগুলো তার কেমন ফুলে ফুলে থাকতো। আর তার সাথে লেগে থাকতো কালো লাল রঙ। আঙুলগুলো থেকে রঙের গন্ধও আসতো। কুজো হয়ে সে দিনমান জুতোস্যান্ডেলে সেলাই বা রঙ করে যেতো।

আমরা যারা ছোট, যাদের হাতে বাড়ির জুতোস্যান্ডেলের ব্যাগ, তাদের জন্য কঠিন ছিলো কমলার লাইন পাওয়া। তার চটের ওপর জুতোস্যান্ডেলের সিরিয়াল লেগেই থাকতো। আমরা মিনমিন করে বলতাম, তিনটা স্যান্ডেল, কখন দিবেন?
'কী হৈছে?' বলে কমলা স্যান্ডেলগুলো নির্মমভাবে পরখ করতো, তারপর আবার ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে একপাশে রেখে দিয়ে বলতো, বিকালে।

আমরা তখন একটু সংকটে পড়ে যেতাম। যে বাড়ি গিয়ে বিকালের কথা বললে ভর্ৎসনা শোনার সম্ভাবনা থাকে, ফলে আমরা একটু গাইগুই করতাম। কমলা আমাদের দিকে তাকিয়ে, একটা বিড়ি জ্বালিয়ে, হাতের কাজটা শেষ করে, আমাদের পলিথিন টেনে নিতো। এরমধ্যে সূক্ষ্ণ দুর্নীতি থাকতো। এই দুর্নীতি আমাদের ভালো লাগতো। আমরা, বলা যায় শৈশব থেকেই, দুর্নীতিপ্রবণ ছিলাম।

মেরামতের পর তিনটা স্যান্ডেলে হয়তো তিনটাকা বিল আসতো। আমরা খুব চেষ্টা করতাম সেটাকে দুটাকায় নিয়ে আসার। কারণ একটাকা বাঁচাতে পারলে তাতে কাঠিবরফ বা নারকেল বরফ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চাটনি হতে পারে। বা কটকটি। কিন্তু কমলা ছিলো বেরহমদিল। সে পইপই করে তিনটাকা গুনে গুনে নিতো। আমরা কিছুটা হাসিমুখে, কিছুটা ব্যাজার মনে, স্যান্ডেলগুলো নিয়ে ফিরতাম বাড়িতে। বাড়ি তখন আরো একবার স্যান্ডেল পরীক্ষা করতে বসতো। ভালোমতো দেখে, সাধারণত, কমলার প্রশংসাই করতো।

তো, কমলা চামার, বা মুচি, ছিলো প্রশংসনীয়।
হাতের কাজে সে ছিলো পটু।
ফলে বাজারের মধ্যে তার বসাটা ছিলো, অন্য মুচিদের তুলনায়, রাজকীয়। আমরা তাকে রাজা জ্ঞানই করতাম।

এর পনের বছর পরের ঘটনা বলি।
না, কমলা মুচি তখনো বেঁচে আছে। রহনপুর গেছি। স্যান্ডেলের একটা ফিতা দাঁত বের করে দিলো। মানুষের হাসি সহ্য করা যায়, স্যান্ডেলের হাসি যায় না। স্যান্ডেলটার হাসি বন্ধ করতে ছুটলাম বাজারে। ছোটাটা হলো দেখার মতো, মনে হয় খানিকটা উটের মতো, খানিকটা লেংচিয়ে লেঙচিয়ে।

বাজারে গিয়ে দেখলাম মুচিদের কারবার ছোট হয়ে এসেছে।
কেন ছোট হয়ে এসেছে? মানুষের পায়ের সংখ্যা, জুতো স্যান্ডেলের সংখ্যা কি কমে এসেছে?
নাকি, পেশা হিশেবে মুচিত্বকে আর গ্রহণ করছে না পরের জেনারেশন?

যাই হোক, চার পাঁচজন মুচির ভেতর একটু খোঁজ লাগালাম কমলার। কমলা আছে, বাজারের এক কোণায় জবুথবু হয়ে সে আছে। আরো আরো বয়স বেড়েছে। এখন তাকে পুরুষ বা মানুষ দূরের থাক, মুচিও লাগে না।
গেলাম তার কাছে, স্যান্ডেলটা এগিয়ে দিলাম। কেমন আছে জিগ্যেস করলাম।
উত্তরে কী বলল কিছুই স্পষ্ট হলো না।

দেখলাম, তার হাত কাঁপছে। স্যান্ডেলের কোথায় সমস্যা খুঁজে পাচ্ছে না। আমি ঝুঁকে দেখিয়ে দিলাম স্যান্ডেলের হাসিটা। কমলা আমার দিকে চোখ তুলে, যেন সূর্যকে দেখছে এমনভাবে কপাল-ভ্রু কুচকে দেখলো, দেখে অবশ্যই চিনতে পারলো না। তার ঠোঁটের দুইকোনে শাদা ঘা। রঙলাগা হাত থেকে বোধহয় গন্ধটাও আসছে না।

কমলা স্যান্ডেল সেলাইয়ের প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু সেই তৎপরতা আর কই? সেই চটপটে ভাব?
মোটা সুইটা স্যান্ডেলের অন্য জায়গায় ঢুকিয়ে দিলো সে। 'গেল গেল' বলে উঠল মন। ভাবলাম, স্যান্ডেলটাই বোধহয় এবার গেলোই! কমলা এখানে ওখানে সুঁইটার ফোঁড় দিয়ে, একেবারে কোনোমতে সেলাই শেষ করলো। সেলাইয়ের পরেও দেখলাম স্যান্ডেল হাসছে। বৃদ্ধ বয়সের সাথে আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না কমলা- একদার মুচিরাজা। তার চোখ, তার হাত, তার হৃদয় কিছুই আর তার সঙ্গে সংগাতে বসছে না।

স্যান্ডেলটা পায়ে গলিয়ে টাকা দিয়ে যখন ফিরছি, আমার প্রদত্ত টাকা হাতে নিয়ে নেড়ে, শূন্যদৃষ্টিতে কমলা বলে, বাবু, আর পাঁচটা টাকা দিবেন?

মুচিরাজ কমলা এখন কেমন আছে কে জানে! আমার স্যান্ডেল ছিঁড়লে তার কাছে আর যাওয়া হয় না। রহনপুর অনেক দূর। কমলা, তুমি ভালো থেকো।





আনন্দ-বেদনার তীর্থকেন্দ্র : মুক্তাশা সিনেমাহল


সিনেমা হলের নাম ‘মুক্তাশা’।

নামের মধ্যে এক অন্যরকম অনুভূতি। শৈশবের বড় পর্দা, রূপালি পর্দা, স্বপ্নের পর্দা বলতে যা বোঝায় তা ওই মুক্তাশাহল।
বাঙালি মধ্যবিত্ত তখন দলে দলে, সপরিবারে, সিনেমা দেখতে যেতো। সিনেমা ছিলো মাসিক খোরাক। কারো কারো সাপ্তাহিক- তাদের তখন ঈর্ষা করতাম।

বড় পর্দায় আমার প্রথম সিনেমা দেখা ওই মুক্তাশা সিনেমাহলে। আমরা তখন সিনেমা বলতাম না- বলতাম, বই। অমুক বই এসেছে, তমুক বই এসেছে ইত্যাদি।
প্রথম কী সিনেমা দেখেছিলাম তার নাম কী করে কই? কারণ, তখন তো আমি গ্যান্দাপোলা। আম্মার কোলে চেপেই গিয়েছিলাম নিশ্চয়। মহিলাদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বসে অন্যান্য বাচ্চাকাচ্চাদের সাথে চিৎকার করতে করতে সময় পার হয়েছিল, এমন ধারণা করি।

এখন যে-বইয়ের কথা মনে পড়ে তা হলো ‘বিরোধ’।
আম্মা আব্বার সাথে গিয়েছি। মুক্তাশা সিনেমাহলের এ-ক্লাশের নাম নিরালা। আমরা নিরালায় বসেছি। হাতে একঠোঙা বাদাম। বয়স কোলে চেপে থাকার মতো হলেও বসেছি একটা চেয়ারে। ফলে, ছোট্ট দিলেও ভাব চলে আসছে। বাদাম কখন খাবো বুঝতে পারছি না- সিনেমা পর্যন্ত অপেক্ষা করবো না আগেই শুরু করে দিবো সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকা। দেখলাম সবাই উঠে দাঁড়াচ্ছে। আমি আম্মার দিকে তাকালাম। আম্মাও উঠে দাঁড়াচ্ছেন। ফলে আমিও উঠে দাঁড়ালাম।
ঝিরঝিরে পর্দায় পতপতে পতাকা উড়ছে। আমি পতাকা দেখছি আর দেখছি মাথার ওপর দিয়ে রঙিন একটা ফোকাস চলে যাচ্ছে পর্দায়। আমার সমস্ত বিস্ময় ওই ফোকাসের ওপর। ফোকাসটা আসছে একটা চারকোনা ফুটো দিয়ে। আমার ইচ্ছা ওই ফুটোয় উঁকি দেয়ার। কিন্তু ইচ্ছাটা কাজে বদলাতে যাওয়ার আগেই আওয়াজ, পর্দায় লেখা, বইয়ের কলাকুশলীদের নাম। আমি পড়তে পারি তখন- ফলে পড়লাম শাবানা। বোম্বে থেকে আগত রাজেস খান্না। আর এখন মনে পড়ছে মাস্টার তাপুর না। মাস্টার তাপুর নাম মনে পড়ার কারণ- মাস্টার তাপু ঠোঁট উল্টে কাঁদতে কাঁদতে যে গান গেয়েছিল সে-গান অনেকদিন আমার ভেতর ছিল। আমি বিরাট পর্দায় বিরাট বিরাট মুখ দেখে বাদামের কথা ভুলে গেলাম।
কিছুক্ষণ যেতেই আমার পেশাব পেলো, আমি পেশাবের কথাও ভুলে যেতে চাইলাম। বইয়ে এত দুঃখ, এত আনন্দ, এত মজা আমার কিছুই মনে থাকলো না। অথবা, সিনেমার ভেতরের যে আনন্দ দুঃখ বেদনা তার কিছুই আমি বুঝছিলাম না- আমার হয়তো ভালো লাগছিল বড় বড় রঙিন রঙিন মানুষগুলো। এ ভালোলাগা থেকে গেল আজীবন।

তারপর বড় হয়েছি আর মুক্তাশা সিনেমাহলের সাথে আমাদের সম্পর্কটা গভীর ও লম্বা হয়েছে। হলটা আমাদের বাড়ি থেকে দূরে নয়। তবু, সিনেমাহলে যাওয়াটা ছিল অনেকটা উৎসবের মতো। প্রথমে পরিবারের সাথে, পরে বন্ধুবান্ধবের সাথে, আরো পরে একা একা হলের ভেতর ঢুকেছি বই দেখার জন্য।

মনে পড়ছে, হুমায়ুন ফরিদীকে বড় পর্দায় প্রথম দেখেছি ওই মুক্তাশা সিনেমাহলেই। সিনেমার নাম ত্যাগ। নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। বি-ক্লাশে বসেছি। লম্বা লম্বা টানা বেঞ্চ। চারদিক থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে কটু। তারমধ্যে আমি আর আমার ভাই বেশ আয়েশ করে জমিয়ে তাকিয়ে আছি পর্দার দিকে। হাতে বাদাম নেই।
সিনেমা শুরু হলো। প্রথম দৃশ্যেই দেখলাম নায়ক গেল মরে। অত্যন্ত চিন্তার কথা। হুমায়ুন ফরিদী লাল রঙের একটা আলখেল্লা পরা। সমুদ্রের তীরে আলখেল্লা পরা হুমায়ুন ফরিদী পুরো আলখেল্লা তুলে, লম্বা ছুরি বের করে, ইলিয়াস কাঞ্চনের পেটে আমূল গেঁথে দিলো। বলল, লাগছে লাগছে জায়গা মতো লাগছে!

হাহাকার জাগানিয়া অবস্থা!
নায়ক মরে গেলে আর থাকে কী সিনেমার! ফরিদী এতো নিষ্ঠুর? এতো পাষাণ?
কিন্তু একটু পরেই দেখলাম আরেকটা ইলিয়াস কাঞ্চন। পুলিশ। হাততালি পড়ে গেলো সিনেমাহলে। শিস বাজালো অনেকে। আমাদের বুকে যেন বল ফিরে এলো। এবার রে ফরিদী?

আরেকটা সিনেমার কথা মনে পড়ছে এখন। নাম বনের রাজা টারজান। নায়ক ড্যানি সিডাক। সুপার হিরোঅলা সিনেমা হলে ড্যানি যেন বাঁধা নায়ক। কোনো এক ঈদে এলো এই সিনেমা। গেলাম ঈদের দিন এই সিনেমা দেখতে। নতুন জামা, নতুন প্যান্ট, পান খাবো কিনা ভাবছি! মনে অত্যন্ত উৎসাহ। পোস্টারে দেখেছি সিনেমার নায়িকা পাতার জামাকাপড় পরে আছে- এ সিনেমা না দেখলে জীবন বৃথা। বাঘ-ভালুক-হরিণ-হাতি-বানর কী নেই এই সিনেমায়?

তবে মুক্তাশা হলের সামনে গিয়ে মনটা দমে গেলো। লোকে লোকারণ্য। শুধু মানুষের কালো কালো মাথা। ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে যেমন লোক হয় তেমন অবস্থা। আর ঠেলাঠেলি, গুতোগুতি, মারামারি পর্যন্ত! টিকেট নেই। না, এমনকি ব্ল্যাকেও নেই। যাহ, তাহলে কি বনের রাজা টারজানকে দেখা হবে না? বেলুনের মতো চুপসে গেলাম। এতো লোকের মধ্যে যেন এই পৃথিবীর আমার কেউ নেই। একটা টিকেট দেয়ার মতো কেউ নেই। হায়, কেউ নেই।

তখনই, বলা যায় আসমানী সহায়তায়, এসে হাজির হলেন এলাকার বড় ভাই। বড় ভাই প্রভাবশালী এবং আমাকে ভালো(!) ছেলে হিশেবে জানেন; ফলে, জিগ্যেস করলেন আমি সিনেমা দেখতে যাবো কিনা!
আমি অনন্যোপায় হয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালাম। বড় ভাই বুক চিতিয়ে লোকের মধ্যে ঢুকে গেলেন তারপর বীরের বেশে টিকেট নিয়ে এলেন। এ টিকেটের উৎস কী তা আমার আজও জানা হয় নি। বড় ভাইও সিনেমা দেখবেন। তার সিট আমার সিট পাশাপাশি। বসলাম। জাতীয় পতাকা দেখানো শেষ হলো। আমি ঠারে ঠাবে ফুটো দিয়ে বেরোনো ফোকাসের দিকে তাকাই। শৈশবের সেই বিস্ময় আজো শেষ হয় নি আমার!

সিনেমা শুরু হলো। নায়ক এলো নায়িকা এলো। দুজনের পোশাকই স্বল্প- লতাপাতা দিয়ে তৈরি। আমার কান গরম হয়ে গেল। বড় ভাইয়ের দিকে তাকাতে পারি না। সিনেমাহল অন্ধকার, কিন্তু পর্দার আলোয় বড় ভাইকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বড় ভাই কিছুক্ষণ পরপর অস্বস্থি নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। বুঝলাম, তাঁঝর কানও গরম হয়ে যাচ্ছে।
বিরতিতে বড় ভাই পেশাব করার জন্য সেই যে বের হলেন আর ফিরলেন না। আমি সিনেমা শেষ করে, নিজে একটা বানর পোষার সিদ্ধান্ত বাড়ি ফিরলাম।

তো মুক্তাশা সিনেমাহল ছিলো আমাদের নতুন নতুন ছবি বই দেখার স্থান। কত না আনন্দ এই সিনেমাহল আমাদের দিয়ে এসেছে। বাংলাদের শত শত সিনেমাহলের মতো এই সিনেমাহলও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে এখন কমিউনিটি সেন্টার হয়েছে। জমকালো কমিউনিটি সেন্টার। মানুষজন মুখরিত।

এই যে মানুষজন মুখরিত বললাম কারণ মুক্তাশা সিনেমাহলের শেষটা ভালো ছিলো। মানুষের ঘরে ঘরে টিভি ভিসিআর সিডিপ্লেয়ার পৌঁছে যাওয়ায় মানুষ হলবিমুখ হয়ে যায়। কিন্তু এটাই কি একমাত্র কারণ সিনেমা থেকে বিচ্ছেদের? মনে হয় না। যতো না দর্শকের দায় তারচেয়ে অনেক বেশি দায় মনে হয় ফিল্ম মেকারদের।
এ নিয়ে বিস্তর তর্ক হতে পারে- কিন্তু সে তর্ক করেই বা আর কী লাভ হচ্ছে? শৈশবের আনন্দ বেদনার তীর্থকেন্দ্র মুক্তাশা সিনেমাহলকে তো আর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারছে না!

মুক্তাশা সিনেমাহলের নামটা ভাঙলে হয় মুক্ত+আশা। আমরা এখন কেউই মুক্ত নই বোধকরি, আর কেউই আশান্বিত নই।

মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৩

একটি অবৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি














সময়ের আগে, ভোরবেলা, ঘুম ভাঙলো প্রধানমন্ত্রীর।

এখনো আলো ফোটে নি। টেবিল ঘড়িতে সময়টা দেখে বিরক্ত হলেন তিনি। এ সময়ে তাঁর ঘুম ভাঙার কথা না। সারাদিন এতো কাজ থাকে, এতদিকে ছুটতে হয়, এত সব সামলাতে হয় যে একটু জিরোবারও সময় পান না; এরমধ্যে যদি ঘুমটাও ঠিকভাবে না হয় তাহলে আর টিকবেন কীভাবে?
নাকটা কুচকালেন তিনি। কোথায় যেন একটা গন্ধ। কিসের গন্ধ?
গতরাতে শোয়ার পর গন্ধটা একটু পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু আমলে নেন নি। ইদানিং কোনো কিছুই তাঁর আর আমলে নিতে ইচ্ছা করে না।
কিন্তু এই ভোরে গন্ধটা একবারে চেপে বসেছে যেন। ঘর ভারী করে ফেলেছে দুর্ঘন্ধটা। তিনি ঝটপট উঠলেন বিছানা থেকে। খাটের নিচটা দেখার চেষ্টা করলেন। কোনো চিকা মরে আছে নাকি? কেউ চিকা মেরে গেছে কিনা, কে জানে!

না, কোনো চিকা টিকা নাই। তাহলে? গন্ধটা অসহ্য লাগছে তাঁর। মনে হচ্ছে সহ্য করতে পারবেন না। নাকে শাড়ির আঁচল চেপে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন। বাইরের বাতাসে কিছুটা সুস্থবোধ করেন। মনে হয় প্রাণটা ভরে গেল। বাতাসটা দারুণ হালকা হয়ে আছে।
কিন্তু পরক্ষণেই বদগন্ধটা আবার পেলেন তিনি। তীব্র। মনে হলো ধাক্কা দিলো তাঁকে। তিনি সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন নিচে। বাইরেটা অনেকখানি খোলা। বেশ বড় মাঠের মতো। প্রহরীরা তাঁকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। সালাম দিলো। প্রধানমন্ত্রী সালাম নিলেন। বললেন, আপনারা কোনো গন্ধ পাচ্ছেন?

এক প্রহরী লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লেখে। সে নিজেকে জাহির করার সুযোগ হাতছাড়া করলো না। বলল, শীত এসে গেছে মহামান্য। বাতাসে শীতের গন্ধ।
-শীতের গন্ধ?
-হ্বী। শীতের গন্ধ মহামান্য। শুকনা শুকনা। মনে হয় পারস্যের গোলাপের মমি!
-আপনি সত্যি প্রহরী, না অনুচর?

কবি-প্রহরী চুপ করে থাকলো। সে ভাবলো প্রতিভা জাহির করতে গিয়ে আজ বোধহয় চাকরিসহ প্রাণটা খোয়াতে হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী দয়ালু। বা তিনি আজ অন্যকিছুতে ব্যস্ত। হতে পারে গন্ধ নিয়ে তিনি চিন্তামগ্ন। তিনি পায়ে পায়ে প্রধান ফটকের দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রহরীরা তাঁর পিছু নিলো। প্রধানমন্ত্রী পেছন ফিরে প্রহরীদের আসতে নিষেধ করলেন। কিন্তু প্রধানপ্রহরি বলল, মহামান্য, আপনার সাথেই আমাদের থাকতে হবে!

প্রধানমন্ত্রী সাধারণত বিরক্ত হোন না। প্রহরীদের সাথে তো হনই না। কিন্তু আজ হলেন। হতে পারে গন্ধটা তাঁকে ঠিকমতো চিন্তা করতে দিচ্ছে না। তিনি কড়াকণ্ঠে বললেন, কে এখানে প্রধানমন্ত্রী? আপনারা, নাকি আমি?

প্রহরী-প্রধান চুপ করে থাকল। প্রধানমন্ত্রী বললেন, একটা গন্ধ আমাকে ঘিরে রেখেছে, আপনারা বুঝতে পারছেন না। হতে পারে শীতে আপনাদের নাক বন্ধ। আমাকে একটু হাঁটতে হবে, আমাকে বাইরে যেতে হবে...

প্রহরী-প্রধান বলল, জ্বি জ্বি অবশ্যই যাবেন মহামান্য। তবে আমরা যদি আপনার পিছে পিছে থাকি তাহলে তো প্রব্লেম হবে না। না থাকলেই বরং প্রব্লেম!

প্রধানমন্ত্রী ছোট্ট একটু শ্বাস ফেলে বললেন, আসুন। পেছনে পেছনে আসুন...

প্রধানমন্ত্রী বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। রাস্তা ফাঁকা। সকালবেলার রাজধানী এখনো জাগে নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জানতেন এ নগরী নাকি কখনো ঘুমায় না! ফাঁকা রাজধানী দেখে তাঁর ভালো লাগল না। তিনি আশে-পাশে তাকালেন। নাহ, কেউ নেই। কিন্তু গন্ধটা আছে, বাজে একটা গন্ধ। আততায়ীর মতো গন্ধ।
প্রধানমন্ত্রী জোরে হাঁটা শুরু করলেন। তিনি হয়তো চাইলেন জোরের সাথে হেঁটে গন্ধটাকে অতিক্রম করবেন।

প্রধান সড়ক ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী একটা গলিরাস্তায় ঢুকলেন। রাস্তায় শুকনো পাতা পড়ে রয়েছে। শুকনো পাতা তাঁর পছন্দ না, তিনি পছন্দ করেন কচি সবুজ পাতা। সবুজ সবুজ পাতা দেখার জন্য তিনি ওপরে তাকালেন। কিন্তু হায়, শীতে সব পাতা ঝরে গেছে। গাছ পত্রপুষ্পহীন। কিছু কিছু গাছ পুড়ে কয়লা হয়ে আছে। গাছদের এমন দুঃস্থাবস্থা দেখে প্রধানমন্ত্রীর খুব খারাপ লাগল। কষ্ট হতে লাগল। গন্ধটা যেন আরো জেঁকে বসলো তাঁর বুকে। তিনি কয়েকবার বড় বড় প্রশ্বাস ফেলে গন্ধটাকে তাড়িয়ে দিতে চাইলেন, কিন্ত পারলেন না।

গলিরাস্তাটা পেরিয়েই দেখলেন একটা পোড়া বস্তি। একদিন গাড়ি করে এ বস্তির পাশ দিয়ে তিনি গিয়েছিলেন। তিনটা পরিবার এখানে বাস করতো। তাঁর গাড়ি দেখে পরিবারগুলো থেকে লোকজন বেরিয়ে এসেছিল। পরিবারগুলোর অনেকগুলো শিশুপুত্রকন্যা ছিল। তাঁর গাড়ি দেখে ছেলেমেয়েগুলো হাত তুলে, পতাকাকে যেমন সালাম করে, অবিকল একইরকমভাবে তাঁকে সালাম করেছিল। তাঁর খুব ভালো লেগেছিল। বুক ভরে এসেছিল। কোনো কারণ ছাড়াই চোখের কোণাটা ভিজে উঠেছিল। তিনিও হাত তুলে ছেলেমেয়েগুলোর সালাম গ্রহণ করেছিলেন।
আজ ওই বস্তির ঘরগুলো নেই। তার বদলে রাস্তায়, দেয়ালে পোড়া পোড়া বিচিত্র দাগ। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টই একটা হাহাকার অনুভব করলেন। তিনি আরো জোরে হাঁটতে শুরু করলেন। পেছনের প্রহরীরা তাঁর সাথে তাল সামলাতে পারছিল না।

প্রধানমন্ত্রী গলিরাস্তা ছেড়ে একটা পুরনো ও বিখ্যাত বাজারের সামনে দাঁড়ালেন। বাজার খালি। কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। বুকের ভেতরের হাহাকারটা আবার ফিরে এলো তাঁর। আর গন্ধটা তো ছিলোই। এখন মনে হচ্ছে গন্ধটা তাঁকে কবর দিয়ে ফেলবে। খুবই কুৎসিত একটা গন্ধ। পচা, জঘন্য একটা গন্ধ।

এমন সময় বিস্ময়টা দেখলেন প্রধানমন্ত্রী। দেখলেন অপরদিকের রাস্তা ধরে একা একা হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে আসছেন প্রধান বিরোধী নেতা। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু যেন একটা খুঁজছেন তিনি। কেমন যেন ছটফট করছেন।

প্রধানমন্ত্রী এগিয়ে গেলেন প্রধানবিরোধীর কাছে। প্রধানবিরোধী বললেন, আপা, গন্ধটা পাচ্ছেন?
প্রধানমন্ত্রী বললেন, আপনিও গন্ধ পাচ্ছেন?
-হ্যাঁ খুবই তীব্র আর বাজে গন্ধ!
-একদম জঘন্য গন্ধ। মনে হচ্ছে মরে যাবো।
-হ্যাঁ মনে হচ্ছে মরে যাবো! কীসের গন্ধ?

প্রধানমন্ত্রী চারদিকে তাকালেন একবার। খা খা রাজধানী। তিনি ছোট্ট করে শ্বাস নিয়ে বললেন, প্রথমে আমিও বুঝি নি। কিন্তু হেঁটে হেঁটে দেখতে দেখতে বুঝলাম গন্ধটা এই দেশের... দেশটা পঁচে যাচ্ছে, গলে যাচ্ছে!
প্রধান বিরোধী বললেন, ঠিক গন্ধটা দেশের। পচন শুরু হওয়া দেশের। বাংলাদেশের।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, এখন আমরাই পারি দেশটার পচন রোধ করতে।
প্রধানবিরোধী বললেন, হ্যাঁ আমরাই আবার শাপলা গোলাপ ফোটাতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী বললেন, হ্যাঁ আমরা চাইলেই নতুন পাতা গজাবে গাছে গাছে। দিকে দিকে আবার কোকিল ডাকবে।

প্রধানমন্ত্রী আর প্রধানবিরোধী দু'জন দু'জনের দিকে তাকালেন, মনে হয় অনেক দিন পর তাকালেন। তারপর তারা হাত ধরলেন, বোধহয় অনেক দিন পর হাত ধরলেন। প্রথমে তাদের সংকোচ হচ্ছিল, কেমন জানি লাগছিল। কিন্তু হাতটা ধরার সাথে সাথে কোথা থেকে একটা সুগন্ধ ভেসে এলো। তাঁরা আবার পরস্পরের দিকে তাকালেন। একটু হাসলেন। আর মনে হলো রাজধানী হেসে উঠল, দেশটা হেসে উঠল।

তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে একটা সুগন্ধ এবার জড়িয়ে থাকল জ্যোতির্ময় হয়ে। হতে পারে সুগন্ধটা কোনো গোলাপের, বা কাঠালিচাপার, বা বাংলাদেশের।


(বি:দ্র: এটি একটি অবৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি মাত্র। ভবিষ্যতের কোনো রাষ্ট্র, কোনো রাজধানী, কোনো প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানবিরোধী নিয়ে এ গল্প রচিত।)


সাক্ষাৎকার

আমি চাই কেউ একজন আমার সাক্ষাৎকার নিক ।
আমার সামনে মাথাটা ঝাঁকিয়ে, গ্রীবাটা বাঁকিয়ে জিগ্যেস করুক নাম!
জানতে চাক আমার বুকের মধ্যে সুতাসাপ হয়ে যে নদী ঘুরপাক খায় বারবার
পুনর্ভবা নামের সাথের যে-সখ্যতা তার
বুৎপত্তি কোথায়?

আমি চাই আমার ধূসরে ডুব দিয়ে কেউ একজন বলুক নির্জন ।
বলুক এই বেঁচে থাকা বিসুখের ঝিনুকের ।
আমি চাই কেউ একজন ফিসফিস করে জাগিয়ে তুলুক অগ্নিলাভা। বলুক,
তুমি তো বাস্তব নও ।
আমি চাই আমার না-থাকা আবিষ্কৃত হোক ।
আমার না-দেখা দৃশ্যতে বদলে যাক ।
আমার ইনসমনিয়াকে কেউ বলুক ঘুম ।

আলজাজিরা বিবিসি না,
আমি চাই আমার সাক্ষাৎকার নিক আমার খুব প্রিয় পরিচিত কেউ ।


২৮।১২।২০১৩

শনিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০১৩

‘পথের পাঁচালী’ আবার দেখার পর


এটা প্রথমেই স্বীকার করে নিতে হয় যে আমি চলচ্চিত্র বোদ্ধা নই। আমার কাছে ‘টাইটানিক’ যেমন ভালো লাগে তেমনি ‘মনপুরা’ও ভালো লাগে; চলচ্চিত্রে আমি খুবই অসমঝদার দর্শক; ফলে হিন্দি মারমার কাটকাট ছবিও আমি আগ্রহ নিয়ে দেখি। পৃথিবীর তাবৎ অসাধারণ চলচ্চিত্রের আমি প্রায় কিছুই দেখি নি। ফলে এটা বলতেই হয় যে দর্শক হিশেবে আমার কোনো জাত-পাত নেই।

তাহলে এই জাতহীন দর্শক হঠাৎ ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে পড়ল কেনো?

কারণটা অস্বস্তি। ক’দিন আগে, হঠাৎ করেই, আবারও পথের পাঁচালী দেখলাম; এবং দেখার পর থেকে এক ধরনের অস্বস্তি ও তাড়না অনুভব করছি। ওই অস্বস্তি ও তাড়না যদি দূর হয়- এমন আশাতেই লিখতে বসা।

‘পথের পাঁচালী’ আগেও দেখেছি, এবং ভালো লেগেছে। সেই ভালো লাগাটা, কবুল করছি, কিছুটা কপটই। বিভ‚তিভ‚ষণের উপন্যাস, সত্যজিৎ-এর চিত্রনাট্য ও পরিচালনা, ভালো লাগে নি বা কম ভালো লেগেছে- তা বলি কীভাবে? তাছাড়া বিশ্বজোড়া খ্যাত ও পুরষ্কৃত এই ছবি; যদি বলি ভালো লাগে নি, আমার বোদ্ধা বন্ধুরা কি বলবে না যে আসলে আমি চলচ্চিত্রের মাথাটাও বুঝি না? তাই সিনেমাটা যতোটা ভালো লেগেছিল দেখে, তারচেয়েও বেশি ভালো লাগার কথা বলেছিলাম, বলতে হয়েছিল।

আগেই বলেছি, আমি চলচ্চিত্র বোদ্ধা নই এবং এ লেখাটিও ‘রিভিউ’ বলতে বাজারে যা বোঝায় তা নয়। বলা যায়, এটা নিতান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি, অস্বস্তি ও তাড়না, থেকে লেখা। কেননা কিছু দৃশ্য আমার মাথার ভেতর এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে, ছটফট করছে।

প্রথম যে দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছি তা কিন্তু মোটেও অপু ও দূর্গার রেল দেখার দৃশ্য নয়। ওই দৃশ্যটা বিখ্যাত বটে, আমার ভেতর আলোড়নও তৈরি করেছে, কিন্তু তারচেয়েও বেশি যে দৃশ্যটা মাথায় আঠার মতো লেপ্টে আছে তা হলো ঘুম থেকে উঠে অপুর পুকুরপাড়ে যাওয়া। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত মনে কয়লা দিয়ে দাঁতমাজার মতো খুব সাধারণ একটা দৃশ্য আমাকে বেশ ওলোট-পালোট করে দেয়। দৃশ্যটা এতোই সাধারণ যে, চলচ্চিত্রে ব্যবহারের পর দৃশ্যটা লহমায় অসাধারণ হয়ে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি দৃশ্যটার সাথে নিজেকে ‘রিলেট’ করতে পারি। আশঙ্কা করি, বর্তমান প্রজন্ম এই ‘রিলেট’টা করতে পারবে না। ফলে তাদের কাছে এই দৃশ্যটার কোনো অর্থ থাকবে না, বা অন্য অর্থ বের করবে। কিন্তু আমার কাছে দৃশ্য স্রেফ শৈশবে ফিরে যাওয়ার ‘টাইম মেশিন’। দেখতে পাই ঘুম থেকে উঠে দাঁতের মাজন নিয়ে চলে গেছি পুনর্ভবা নদীর তীরে। ধোঁয়া ওঠা খুব শান্ত ও নিস্তরঙ্গ সকালে মুখের মধ্যে আঙুল গুঁজে পানির দিকে অর্থহীন তাকিয়ে, বা পানিপোকা দেখে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দেয়ার মতো দৃশ্যগুলো এখন পরাবাস্তব মনে হয়। ওই দৃশ্যে ফিরে যাবার জন্য নিজের ভেতর আকুতি তৈরি হয়।

আরেকটা দৃশ্যের কথা মাথার ভেতর বিদ্যুতের মতো ঝলকে ঝলকে যাচ্ছে- সেটা হলো নিশ্চিন্তপুর গ্রামে ময়রার মিষ্টি ফেরি করতে আসা। ময়রাকে দেখেই অপু ও দূর্গার ছুটে গিয়ে দাঁড়ায়। দূর্গা বাবার কাছ থেকে অপুকে দুটো পয়সা নিয়ে আসতে প্রলুব্ধ করে। অপু বাবার কাছে গিয়ে পয়সা না পেয়ে ফিরে এলে অপেক্ষমাণ ময়রা আবার চলতে শুরু করে- আর তার পিছু নেয় অপু, দূর্গা ও একটা কুকুর। দৃশ্যটিতে একটা কুকুরের নিপুন সংযোজনে পুরো দৃশ্যটি একেবারে নগ্ন হয়ে আমাদের চোখের সামনে চলে আসে। মনে পড়ে যায় আমার শৈশবের ফেরিওয়ালাগুলোকে... বরফঅলা, চাটনিঅলা, কটকটিঅলার পিছু পিছু পয়সাহীন ঠিক কুকুরের মতোই কতো যে ঘুরেছি তার ইয়ত্তা নেই। বাংলাদেশের দরিদ্র শৈশবগুলো তো এরকমই ছিল, ঠিক এরকমই ছিল।
এই দৃশ্যটি সত্যজিৎ দেখিয়েছেন পুকুরের পানির ওপর অপু-দূর্গাদের প্রতিবিম্বের মাধ্যমে- আগে আগে ময়রা যাচ্ছে, পেছনে পেছনে অপু, দূর্গা এবং কুকুর। পানির প্রতিবিম্বে দৃশ্যটি দেখানোর নিশ্চয় কোনো অনন্য ব্যাপার রয়েছে, বা নেই- আমি বোদ্ধা নই বলে এগুলো বুঝি না, কিন্তু পানির কম্পিত প্রতিবিম্বে দৃশ্যটি দেখার ফলে ভেতরে ভেতরে কেমন একটা বেদনা তৈরি হয়। অমন একটা দৃশ্যের অংশ আমি নিজে ছিলাম বলেই হয়তো বেদনাটা পাক খেতে থাকে, খেতেই থাকে।
এরপর দৃশ্যটা আমাদের পেীঁছে দেয় বড় বাড়িতে। যেখানে সবাই হুল্লোড় করে মিষ্টি কেনে- মৃদু আহ্বানেই দূর্গার বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে আর বাহির-দরজার চৌকাঠ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে অপু। তার হয়তো ভেতরে যেতে ইচ্ছা করে- দূর্গা যেমন গেছে; কারণ ভেতরে গেলে দূর্গার কপালে যেমন একটা মিষ্টি জুটে যায়, তেমনি অপুর কপালেও জোটার সম্ভাবনা থাকে; কিন্তু অপু যায় না। অপু দরজার বাইরে থেকে দূর্গাদের দেখতে থাকে। অপুকে দেখে মনেহয় যেন আমি নিজেই দাঁড়িয়ে আছি ধনী কোনো আত্মীয়ের বাড়ির বাইরে। ভেতরে যেতে ইচ্ছা করছে, প্রবলভাবে করছে, কিন্তু কী এক অভিমান কী এক বাধা আমাকে কিছুতেই যেতে দিচ্ছে না- না, কিছুতেই দিচ্ছে না। ফলে আজন্ম দরজার বাইরে, অপুর মতোই, দাঁড়িয়ে রইলাম- এখনো যেমন আছি। ওই দৃশ্যে অপু হঠাৎ স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। অপুর জন্য আমার মায়া হয়, নিজের জন্যেও হয়।

আচ্ছা আরেকটা দৃশ্য আছে না- ওই যে বৃষ্টি শুরু হচ্ছে। তার আগে বেশ কিছু রুদ্ধ সময় গেছে। বৃষ্টিটা আসে ‘রিলিফ’ হয়ে। বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়ে পুকুরপাড়ে অবস্থিত এক লোকের টাকে। এই দৃশ্যটা আমার ভালো লাগে নি; চলচ্চিত্রটির যা আমেজ, এতোক্ষণ পাশ পাশ ধরে যে ছবিগুলো চলচ্চিত্রটা তৈরি করেছে, তার সঙ্গে এই টাকে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার দৃশ্যটি ‘বহিরাগত’ মনে হয়। এতে আমার ভেতর কোনো হাস্যরসও তৈরি করে না- সম্ভবত প্রস্তুত না থাকার কারণেই করে না। তবে পরক্ষণেই দেখি পুকুরভরা বৃষ্টির ফোঁটা। বৃষ্টিতে প্রকৃতির থেকে থেকে কেঁপে ওঠা। আর দেখি অপু-দূর্গার হুটোপুটি ছোটাছুটি... এক সময় জবুথবু হয়ে বৃষ্টিতে ভেজা আর বৃষ্টি ধরে যাওয়ার জন্য ছড়া কাটা। দৃশ্যটা এতো সাধারণ আর স্বাভাবিক যে মনে হয় চলচ্চিত্র নয়, জানালা দিয়ে অপু আর দূর্গার বৃষ্টিস্নান দেখছি। দৃশ্যটির সাথে বারবার নিজেও ভিজে যাই। আবার বৃষ্টিতে ভেজার আকাক্সখাও তৈরি হয়। দূর্গা যখন হাঁচি দেয়, নিজের নাকের কাছেও তখন সুড়সুড় করে শীত অনুভব করি।

আরেকটা খণ্ডদৃশ্য মনে পড়ছে- দূর্গা মারা গেছে। ঝড়-বৃষ্টিতে ভিটে বাড়ি ভেঙে-চুরে-গলে গেছে। অপু তেল আনতে যাচ্ছে। দাওয়া থেকে বাইরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে অপু ফিরে আসে। তারপর ঘরের ভেতর থেকে একটি ছাতা নিয়ে বের হয়। তেলের বোতল হাতে ঝুলিয়ে, বগলে ছাতা দেবে, অপু চলে যায়।
বৃষ্টিকে অপুর ভয় পাবার কথা নয়- তাহলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছাতা নেয়া কেন? দিদির মৃত্যু কি তাকে সাবধানী করে তুলেছে? নাকি ওই মৃত্যু তার বয়স বাড়িয়ে দিলো? অপুর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নগুলো খচখচ করে, করতেই থাকে।

‘পথের পাঁচালী’তে বিখ্যাত অনেক দৃশ্য আছে। অপু-দূর্গার প্রথম রেল দর্শন, দূর্গার চুরি করা মালাটা অপুর দেখতে পাওয়া এবং পানা-পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে সত্যটাকে মহাকালের অতলে ডুবিয়ে দেয়া, ভিটে ছেড়ে যাবার পর ঘরের ভেতর সাপের ঢুকে যাওয়া। দূর্গার জন্য বাবার শাড়ি নিয়ে আসা ইত্যাদি। প্রতিটি দৃশ্যই অসাধারণ, খুবই অনন্য। কিন্তু ওপরের ওই সাধারণ দৃশ্যগুলো আমাকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে- তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। শৈশবের দিকে ধাক্কা মারছে।
অপু

বিশ বছর পরের একদিন




তোমার হাত ঘড়িটা তোমাকে ভাবাচ্ছে।

অনেকক্ষণ ধরেই ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছ। অ্যানালগ ঘড়ি। এক সময় বাবা পরতেন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর সব কাপড়-চোপড় দান করে দেয়া হয়েছে; শুধু ঘড়িটা ঠাঁই পেয়েছে তোমার হাতে। ঘড়িটা এখন আর সুদৃশ্য নেই। বরং বলা যায়, এই সময়ের জন্য ঘড়িটা বেশ বিসদৃশ। ঘড়ির রূপালি রঙ করা বেল্ট আর রূপালি নেই। চটা উঠেছে। দেখে মনে হয় বয়ষ্ক ঘড়ি। আর অবশ্যই তা তো বয়ষ্ক। কিন্তু, যত বয়স তার চেয়েও বেশি বয়সের মনে হচ্ছে ঘড়িটাকে।

নিজের সাথেই তুলনা করছ নাকি?

তোমারও তো অবস্থা তথৈবচ। বয়স চলিস্নশ নাকি, নাকি পঁয়চলিস্নশ? অথচ দেখায় পঞ্চান্ন বা তারো বেশি। গাল ভেঙ্গে গেছে। বুকের চারটি পাঁচটি লোমে পাক ধরেছে। তারচেয়েও বড় কথা কপালের উপর পড়ে থাকা একগোছা চুলে সাদা রঙ, দু'জুলফি ধরে চুনকাম। বলা যায় চটা উঠেছে।
কিন্তু এসব তো তুমি মেলাচ্ছ না। ঘড়িটার দুটি কাটা খাড়াখাড়ি ভাবে গিয়ে থেমে আছে। ঘড়িতে বাজছে বারটা তিরিশ; এবং ঘড়িটা থেমে আছে। কাটা চলছে না, কাটা চলছে না। দেখে মনে হচ্ছে না, তোমার জীবনের কথাই বলছে ঘড়িটা! জীবন দুইদিকে দুহাত প্রসারিত করে, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে; এবং থমকে গেছে। চলছে না চলছে না।

তাহলে কী চলছে?

অযাপন?

জীবন মানে যে চলা। বাবার প্রিয় একটা সিনেমা ছিল। হিন্দি। নাম চালতে কি নাম গাড্ডি। চলার নামই গাড়ি। অনেকপরে তুমি ঠিক করেছিলে যে আসলে চলার নামই জীবন। চালতে কি নাম জিন্দেগি!

কিন্তু চলছে না তো। থেমে আছে। এভাবে আর কতক্ষণ কতদিন!

অবশ্য এখান থেকে উঠে গেলেই অন্যরকম চলা শুরু হবে। আট বছর থেকে থমকে থাকা জীবনটা জঙ্গম হবে। এখানে লোকজন আসবে, তোমাকে খুঁজবে। ওরা তো তোমাকে কাচ ঘেরা অফিসটায় ঢুকতে দেখেছে- তোমাকে না পেয়ে ফোন দেবে। অবশ্য ফোন দিয়ে এখন আর তোমাকে পাওয়া যাবে না। ফোন নেই। কদিন আগেই তা হারিয়েছ। হারিয়েছ? এতটা বেপোরায়া বেখেয়ালি তুমি কীভাবে হতে পারো?

পারো না কি?

ছেলেবেলায় কালো ছোট্ট খেলনা পিস্তলটা তো সারাদিন চোখে চোখে রাখতে। পিস্তলটা বিদেশ থেকে এক আত্মীয় এনে দিয়েছিল এই জন্যই কি? বিদেশ থেকে অবশ্য খেলনা ট্রেনও এসেছিল, পুতুলও। ওগুলোর প্রতি তেমন মোহ ছিল না। কিন্তু মোহময় ছিল পিস্তলটা। কী দারুণ পিস্তল! হাফপ্যান্টের পকেটের ভিতর থাকতো পিস্তলটা। নলটা শুধু অসভ্যের মত উঁকি দিয়ে চোখ রাখত বাইরে। মনে হতো বাইরে কে কী করছে তা দেখতে আগ্রহের সীমা তার নেই!
রাতে ঘুমাতে যেতে পিস্তল নিয়ে। বালিশের পাশে রাখতে। সত্যিকারের ব্যবহারকারীরা বালিশের পাশে পিস্তল রাখে ভয়ে, তুমি রাখতে ভালোবাসায়। ইশকুল যাওয়ার সময় নিয়ে যেতে। চোর-পুলিশ খেলার সময় দারুণ ব্যবহার হতো পিস্তলটার। ওই পিস্তলটার বদৌলতে ইশকুলের খেলায় নেতা হয়ে উঠছিলে। তখনো জানো নি, পিস্তল মহার্ঘ; যে কোনো খেলায় তা তোমাকে নেতা করে দিতে পারে।

সেই পিস্তলটা কি ফয়সাল চুরি করে নি? মোটা ফয়সাল। মাংস মাংস মাংস আর মাংস ফয়সাল। ইশকুলের পাশেই ডোমদের শূয়োর চরতো, ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ করত, ময়লার মধ্যে ডুবে থাকত আপদমস্তক; ফয়সালকে তেমনই শূয়োর মনে হতো। যার বাবাও ছিল শূয়োর বিশেষ। কালোবাজারি ও ঋণখেলাপি। যদিও ফয়সালকে তুমি কখনো শূয়োরের বাচ্চা বলে গালি দাও নি। কিন্তু দিতে পারলে ভালো লাগত। সবচেয়ে ভালো লাগত ফয়সালের বাবাকে গালিটা দিতে পারলে। যদিও ফয়সালের দাদাও শূয়োর কিনা এ ব্যাপারে তুমি কোনোদিনই নিশ্চিত হতে পারো নি।

তো ফয়সাল তোমার বাড়ি এসেছিল। তখন তো যাতায়াত হতো, না? এর বাড়ি সে যেত, তার বাড়ি তুমি যেতে। সামাজিক যোগাযোগের জন্য তখন কোনো সাইট টাইট ছিল না। সামাজিক যোগাযোগ হেঁটে হতো, সাইকেলে হতো, ট্রেনে-বাসে হতো। বাসের পাশের সিটে বসে থাকা লোকটা জিজ্ঞেস করত, কোথায় থাকেন? কী নাম? কী করা হয়? ইত্যাদি। একসময় বেরোতো তোমার চাচাকে বা মামাকে বা বাবাকে সে চেনে। তুমিও তার কাউকে না কাউকে চেনো। পরিচয় হয়ে যেত। একসাথে চা খাওয়াও হতো। বাড়ির দাওয়াত লেন-দেন পর্যন্ত হতো। তবে শেষ পর্যন্ত আর কারো বাড়ি যাওয়া হতো না। পথের দাওয়াত পথেই ফুরাতো, ঘরোয়া হতো না।

তো এক ঘরোয়া দাওয়াতে ফয়সালকে নিয়ে তার মা এসেছিল। দাওয়াতে, নাকি এমনি? ঠিক মনে পড়ছে না তো! ওই যে বললাম বয়সের চেয়েও বয়স তোমার বেশি। তবে ফয়সাল এসেছিল তার শূয়োরের মতো আগাগোরা কোলবালিশ হয়ে যাওয়া শরীরটা নিয়ে। সে হাঁটলে থপ থপ আওয়াজ হতো। সে জোর করে তোমার পয়সা আর ডাক টিকিটের সংগ্রহ দেখতে চেয়েছিল; তুমি জানতে কোনো একটা প্যাঁচ সে করছে। তুমি পয়সা আর টিকিট দেখাচ্ছিল খুব সতর্কভাবে। যেন একটিও না হারায়। কিন্তু ফয়সালের নজর ছিল আসলে অন্যদিকে। পয়সা ও টিকিট ঠিকঠাক মতো রেখে আসার ফাঁকেই পিস্তলটা হাওয়া করে দিয়েছিল ফয়সাল; ঘুণাক্ষরেও টের পাও নি তুমি। হাসতে হাসতে তাদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলতে বলতে মাকে নিয়ে ফয়সাল, কিংবা ফয়সালকে নিয়ে মা চলে গিয়েছিল।

আর কিছুক্ষণ পরেই, পিস্তলটা খুঁজে পাওয়া যায় না। কক্ষণোই পাওয়া যায় না।

বাড়ির সবাই ভেবেছিল তুমি অনেক কান্নাকাটি করবে। সবাইকে ভুল প্রমাণ করে তুমি দিব্যি ইশকুলে গেলে, সকাল-সন্ধ্যা পড়তে বসলে, পাড়ার ক্রিকেট ম্যাচে অংশ নিলে, নদী সাঁতরে সাঁতরে আঙুলের ডগা ফ্যাকাশে করে ফেললে।

পিস্তলের কথা সবাই ভুলে গেল, তবে তুমি মনে রাখলে। ক্ষেত্রবিশেষে তোমার স্মৃতিশক্তি ভালো।

হিমার কথা যেমন তুমি ভোলো নি। একক্লাশ আগে পড়ত। তবে সমবয়সী তো। যে বুড়ি চু খেলা তোমার কোনোদিন ভালো লাগে নি, হিমার জন্য তা-ও তো খেলতে; এবং চাইতে হিমার বিপরীত দলে থাকতে। তাহলে হিমার চাটি খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না! হিমা, নরম কোমল, হিমা পাতলা লম্বা, হিমা মসৃণ। ববকাট চুলে একটা টায়রা দিয়ে গার্লস-ইশকুলের নীল ড্রেস পরেই সে খেলতে চলে আসতো। তখন সিক্স কি সেভেনে পড়ত। না না সেভেনে। তুমি তো তখন হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্টে গেছ। খাকি প্যান্ট আর সাদা শার্ট পড়ে হাই-ইশকুল যাওয়া ধরেছ। মায়ের আজন্ম করে দেয়া চুলের পাট ভেঙে নতুন নতুন চুল আঁচড়ানো শিখছ। আয়নার সামনে বেশ কিছুক্ষণ কাটে তখন তোমার। লুকিয়ে একটা ফেয়ার এন্ড লাভলির টিউবও শেষ হয়ে গেছে। একুশ টাকা জোগাড় হচ্ছে না বলে আরেকটা কেনা হচ্ছে না, এই যা!

ঠোঁটের উপর সরু গোঁফ উঠেছে। সেগুলো গোঁফ না বলে লোম বলাই ভালো। সেগুলো কাটা প্রয়োজন, কিন্তু সুযোগ হচ্ছে না। পায়খানায় একটা কেঁচি নিয়ে কয়েকদিন চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু কাজটা বিপদজনক মনে হয়েছে তোমার কাছে। আধা-ঘন গোঁফ নিয়ে ক্রিকেট ছেড়ে বুড়ি চু'র মাঠে বেশি যাও তুমি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখ। ভাগ্য ভালো থাকলে হিমার বিপরীত দলে সুযোগ হয়। ভাগ্য আরো ভালো থাকলে হিমার ইশকুল ড্রেস সরে গিয়ে কাঁধের কাছে বেরিয়ে আসে সাদা সেমিজ। এই সাদা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অন্ধ করে দেয়। কয়েক ঘন্টা কয়েক বেলা কয়েক দিন আর কিছু দেখতে পাওয়া যায় না।

একদিন খেলতে খেলতে বুলার টানে হিমার ইশকুল ড্রেসের পিছনের হুক ছিঁড়ে যায়। সাদা পিঠ বেরিয়ে যায়। সাদা, নাকি অন্য কোনো রঙ? ওই রঙ আসলে কী তা কি কোনোদিন বলা যায়, বোঝানো যায়? পিঠটা বেরিয়ে যায়। পিঠের একটা অংশ বেরিয়ে যায়। হিমা তো কেঁদে ওঠে; রাগে কেঁদে ওঠে, ভয়ে কেঁদে ওঠে। তার মা মেরে ফেলবে এমন আশঙ্কায় সে খড়ের গাদার পিছনে লুকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ।

তুমি তো তাকে আবিষ্কার করেছিলে, তাই না?

আবিষ্কারটা কেমন ছিল? খড়ের গাদা ঘুরে মুরগির ডিম পাবার মতো? কখনো কখনো সাপের ডিমও তো পাওয়া যেত। চেনা যেত। সাপের ডিম আর মুরগির ডিম আলাদা করা যেত। সেদিন যায় নি। হিমাকে আর কিছু থেকে আলাদা করা যায় নি। হিমার নাভির কাছের তিলটাকেই মনে হয়েছিল পরশ পাথর; তা ছুঁয়েই তুমি সোনা হয়ে যাচ্ছিলে! কিন্তু হিমা তোমাকে আরো সোনার সন্ধান দিয়েছিল; তোমার মনে হয়েছিল তুমি বোধহয় মারা যাচ্ছ, মরেই গেলে কয়েকবার; নাগরদোলার চূড়া থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ যেমন শূন্য হয়ে যায় শরীর, বুক খালি হয়ে যায়, দুলে ওঠে মাথা--ঠিক তেমনই দোলা দিয়েছিল হিমা, হিমার সমস্ত কাঞ্চন; সেই দোলা নিয়ে তুমি তো ছিলে হাজার হাজার দিন।

হিমার গ্রীবার সুঘ্রাণ তুমি কি এখনো পাও না ঘুমালে?

সেদিনের পর থেকে বুড়ি চু বদলে গেল, ফেয়ার এন্ড লাভলি বদলে গেল, চুলের ভাঁজ বদলে গেল। মাঠের পেছনের খড়ের গাদা বদলে গেল। খড়ের গাদা একটুকরো মেঘ হয়ে গেল। বারবার মেঘ হয়ে গেল। মাঝে মাঝে পাখি হলো। আর এক সন্ধ্যায় ঠিক ঠিক বৃষ্টি হয়ে গেল। বর্ষা হয়ে গেল। তারপর আবার বদলে গেল সব কিছু।

তখন কলেজ। রাজনীতি এলো। বান্ধবী এলো। গাঁজা এলো। হিমা কি দূরে সরে গেল? দূরে চলে গেল? নাহ্‌! তখনো হিমা ছিল, এখনো যেমন আছে। আছে না? এখনো স্বপ্ন কাতর হয়, এখনো বাতাস ঝিমঝিম করে ওঠে। ওঠে না কি?

কিন্তু হিমার যে বিয়ে হলো? অন্য কোথায় চলে গেল। দূরে কোথায় চলে গেল।

তাতে কি? সিগারেট খাওয়া বাড়লো, সিনেমা দেখা বাড়লো, মাস্টারবেশন বাড়লো। ফেয়ার এন্ড লাভলির টিউব কেনা বন্ধ হলো। এছাড়া সব ঠিকঠাক থাকলো। মিছিল হলো। বাংলা মদও হলো একদিন। গাঁজা হলো মাঝে মাঝে। ব্যাং কাটা হলো, অণুবীক্ষণ আঁকা হলো বিস্তর। জীবনের ঘড়ি চলতে থাকলো টিকটক টিকটক।

তবে এখন আর চলছে না। বন্ধ। অন্ধ ঘড়িটার মতো বন্ধ। দুহাত প্রসারিত করে বন্ধ।

রক্তের প্লাবনের ওপর ফয়সাল ঘুমিয়ে আছে নিশ্চিন্তে। তার অতিকায় ভুঁড়িটা ফেটে কাদার মতো ছড়িয়ে আছে। অথচ মুখটা কী শান্ত আর সৌম! ফয়সালকে এর আগে এত ভালো করে দেখা হয় নি তোমার। এখন আর তাকে শূয়োর শাবক মনে হচ্ছে না!

তুমি ফয়সালের ঘর থেকে চুরি করা আসল পিস্তলটা ফেলেই দিলে মেঝেতে। এখন এটার আর দরকার নেই। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। তোমাকে একটা ফোন-ফ্যাক্সের দোকান খুঁজতে হবে।

নম্বরটা মনে আছে তো? ০১৯১৩২৭৭২৮৩। হ্যাঁ হ্যাঁ, ক্ষেত্রবিশেষে তোমার স্মরণশক্তি ভালো।

হিমাকে জানাতে হবে ফয়সাল মারা গেছে। তার আইনসম্মত পুরুষটি মারা গেছে। মারা গেছে। মারা গেছে। যদিও অনেক আগেই উচিত ছিল মারা যাওয়া!

এতদিন পর।

তুমি নম্বরটাতে চেষ্টা করেই যাচ্ছো, করেই যাচ্ছো, ওপ্রান্ত থেকে কেউ ফোন ধরছে না। বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে তোমাকে। ফোনওয়ালা তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার ফোনের দিকে; ফোনটাও ভিজে যাচ্ছে। আকাশ পাতাল সব ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টিতে। আর তুমি থেমে আছো, অনড় অন্ধ ঘড়িটার মতো।
ভুলে গেছ মৃত মানুষ ফোন ওঠায় না।


( মাসিক 'উত্তরাধিকার' এ প্রকাশিত)

লিংক: 
http://uttaradhikar.banglaacademy.org.bd/magazine/1419/Asshin%201419/index.html#/126

যবনিকা


নীলাকে ভালোবেসেছিলাম। 
তারপর ক্রমাগত অনেককে। আমার জীবনে ভালোবাসা এসেছে অক্লান্ত। একেকটি ভালোবাসা একেক ভাবে। প্রত্যেকটি ছিল আগেরটির চেয়ে উজ্জ্বল, চমত্‍কার। জীবনকে মনে হত ইক্ষু। প্রতি গাঁটে গাঁটে মিষ্টতা। আমি যেন প্রজাপতি; গাঁদা থেকে রজনীগন্ধা থেকে গোলাপ। নীলার পর কুসুম, কুসুম কন্টকাকীর্ণ হলে স্নিগ্ধ স্নিগ্ধা। মনে হয়েছিল বনলতা সেন। পাখির নীড়ের মত চোখ। আমি কিন্তু থেমে যাইনি। স্নিগ্ধার মুখোমুখি অন্ধকার হবার আগেই রূপসী রোদেলা। আহ্, জীবনটা একেবারে খাস্তা- মুরমুরে... তিল মেশানো খাজা। একটু কামড় দিয়ে মুখে নিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে স্বাদ নাও। সে স্বাদের ঘোর ঘুরপাক খেতেই থাকে। রোদেলা যেতে না যেতেই বৃষ্টি হাজির। খাসির রেজালা সাথে দই। আঙুল চেটেপুটে খাও। উফ্... 
তারপরই ঘটে গেল বিভত্‍স ঘটনাটা। 
জীবনটা থমকে গেল। একই জায়গায় ঘুরছে তো ঘুর... 
আর লিখতে পারব না। নীলা এসে গেছে। 
হ্যাঁ, সেই নীলা। ওর সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। 


অতঃপর, সব কিছুর যবনিকা ॥


(প্রকাশ: রস+আলো)

সিগারেট


শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিলাম। দিতে পারলাম আর কি! কঠিন ছিল। কঠিন হবে না? এত দিনের অভ্যাস। ঘুম থেকে উঠে, ঘুমাতে যাবার আগে। জেগে থাকা অবস্থায় একটু সুযোগ পেলেই। অফিস থেকে নানা অজুহাতে বেরোনো। এ নিয়ে কম হাঙ্গামা! তাছাড়া অর্থহানি, স্বাস্থ্যহানিও বটে। অতএব ছেড়ে দিলাম। দেয়াই তো উচিত। কেউ নিষেধ করেনি; বন্ধু বান্ধবরা তো বাহবাই দিল- যদিও মনে হল কেউ কেউ ভাল ভাবে নেয়নি। তাতে কি বা এল গেল! আমি পেরেছি এটাই বড় কথা। নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিতে ইচ্ছা করে। নিজেকে এখন মুক্ত স্বাধীন মনে হচ্ছে। পেরেছি। কঠিন ছিল। কিন্তু পেরেছি। মুন্নিকে বলে দিয়েছি ওর সাথে আর মোবাইলে কথা বলব না। প্রেম ট্রেম সব শেষ। মেয়েটার সবই ভাল ছিল, কিন্তু যখন তখন খালি খালি সিগারেট ছেড়ে দেবার কথা বলত। ওকেই ছেড়ে দিলাম। কঠিন ছিল, কিন্তু পারলাম। পারব না কেন? 


সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ধূমপান হৃদ রোগের কারণ। 


( প্রকাশ: রস+আলো)