বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০১৫

হে রাম! হে রাম!!




দেশ তখন স্বাধীন হয়েছে। দেশ মানে ভারতবর্ষ। ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়ে ভারত আর পাকিস্তানে ভাগ হয়েছে। একটা ভূখণ্ড নাকি হিন্দুর একটা নাকি মুসলমানের। এপাড়ের হিন্দু ওপাড়ে যায়, ওপাড়ের মুসলমান এপাড়ে আসে। এপাড় ওপাড় জুড়ে দাঙ্গা। মারামারি। লড়াই। খুনাখুনি। এই খুনাখুনি যে হবে তা জানতেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তাই তিনি এই দ্বিজাতিতত্বের বিভক্তি চান নি। এমনকি তিনি সন্দিহান ছিলেন স্বাধীনতাতেও। তিনি ভয় পেয়েছিলেন এই ভারতবর্ষের অর্ধশিক্ষিত রাজনীতিবিদরা সত্যিকারের দেশ শাসন করতে পারবে কিনা! তিনি তাই প্রাথমিক অবস্থায় স্বরাজ চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারতবর্ষ দু'ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়ে স্বাধীন হয়। নেহরুর হিন্দুর হিন্দুস্থান আর জিন্নাহর মুসলমানের পাকিস্তান। দাঙ্গা চলতে থাকে। মানবতা রাম আর রহিমের মধ্যে এক সর্বভূক আগুন হয়ে জ্বলতে থাকে। ইংরেজরা ততক্ষণে রাণী এলিজাবেদের কোলে বসে লবেনচুষ চুষছে আর মজা দেখছে। কলকাতা যেন পুড়ে ছাই। গঙ্গা হিন্দু মুসলমান তথা মানুষের লাশে স্রোতহীন। যেন স্রোত তত দিনে রক্ত হয়ে গেছে। রক্ত গাঢ় হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। বন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে ফসলের খেত। পাখি যেন আকাশে ওড়ে না। বাতাস ধর্মান্ধ হৃদয়ের গন্ধে মৌ মৌ করছে। কলকাতা পাগল হয়ে গেছে। গান্ধী তখন তাঁর আশ্রম ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। ওদিকে লাহোর তথা পাকিস্তানও জ্বলছে। গান্ধী কলকাতা ঘুরে এসেছেন, বলেছেন অহিংসার কথা, কলকাতা স্থিমিত; এবার গান্ধী লাহোর যাবেন। বেরিয়েছেন তিনি। আশ্রম পেরিয়ে মাঠ। নেতারা গাড়িতে গান্ধীর জন্য অপেক্ষা করছেন, তাদের শেষ ভরসা ইংরেজদের এই ন্যাকেড লিডার। একখণ্ড শাদা ধুতি আর একটা লাঠির ভরে ফটোগ্রাফারের সাথে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছেন। মাঠের প্রান্তে পূজার থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভক্তরা। গান্ধী তাদের দেখে দাঁড়ান। হাতজোর করে নমস্কার করেন। এক ভক্ত এগিয়ে যায় গান্ধীর দিকে। পা ছুঁয়ে আশির্বাদ নেয়। গান্ধী হাত উঁচু করে আশির্বাদ দেন। কিছু যেন বলতে যান। কিন্তু ততক্ষণে ভক্তটা পিছিয়ে আসে দু'কদম। নিজের কোমর থেকে বের করে পিস্তল। লহমায় তাক করে গান্ধীর দিকে। ঠাশ ঠাশ করে দুটো গুলি করে গান্ধীর বুক বরাবর। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে সবাই। এমনকি গান্ধী নিজেও। গান্ধীর হাত থেকে তাঁর চিরসাথী লাঠিটা খসে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রেন থেকে ধাক্কা খাওয়ার অনুভূতি হয় যেন গান্ধীর। তাঁর চোখের সামনে তাঁরই ভক্ত। হাতে পিস্তল। গান্ধী বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। যেন কেউ ছ্যাঁকা দিয়েছে উষ্ণ লৌহ খণ্ডের। ধাক্কা খেলেন গান্ধী। কিন্তু শুধুই কি তা বুলেটের বিপরীত গতির ধাক্কা? আর কিছু নয়? ধাক্কাটা কি অবিশ্বাস আর হতবিহ্বলতারও ছিল না? যে অহিংসায় কেটে গেছে তাঁর সারাটি যাপিত জীবন সে অহিংসার বদলে একি হিংসার চরম রূপ? পিস্তল? বুলেট? ঘৃণা? এত ঘৃণাও কেউ জমিয়ে রেখেছিল তবে কেউ! তার জন্যে এত রিরংসা?
লহমায় গান্ধীর মনে পড়ে যায় তাঁর সহধর্মিনী আর সন্তানের মুখ। আর তাঁর ছাগলগুলোর কথা আর সুতোর কাজ শেষ না হওয়া সেই শান্ত চক্রাগুলোকে। আর ভারতবর্ষের সেই দরিদ্র অসহায় নিপীড়িত মানুষের মুখগুলো, যেগুলো আজো চেয়ে আছে লাঠিতে ভর দেয়া এক পৌঢ়ের দিকে। ভালোবাসার শ্রদ্ধার বাপুজির দিকে। সব ছাপিয়ে গান্ধীর মুখ থেকে এক চরম আর্তি বেরিয়ে আসে-- হে রাম!
হে রাম!!

সোমবার, ৫ জানুয়ারি, ২০১৫

পিকে






এক থা টাল্লি।
এমনই নাম ভেবেছিলেন লেখক পরিচালক রাজ কুমার হিরানি। কিন্তু বাইরে থেকে দেশে যখন ফিরলেন তখন শুনলেন সালমান খানের সিনেমার নাম 'এক থা টাইগার'।

'এক থা টাল্লি' নামটা পছন্দ করে ফেলেছিলেন রাজু হিরানি। অন্য কোনো নামও ভাবতে পারছিলেন না তিনি। স্ক্রিপ্টের কাজ তখন তোড়জোড় চলছে। আর হিরানির কাজের ধরন যেমন একটা স্ক্রিপ্টের অনেক গভীর পর্যন্ত কাজ করতে চান তেমনভাবেই কাজ করে চলেছেন এই নতুন সিনেমাটার। পরে যার নাম তিনি রাখলেন পিকে।

রাজ কুমার হিরানি ভারতীয় চলচ্চিত্রের হাতেগোনা সে-ই কয়েকজন পরিচালকের একজন যার নাম সিনেমা চলে। যার সিনেমা শেষ পর্যন্ত তারই থাকে। একটা নায়কের সিনেমা, বা একটা গানের সিনেমায় পরিণত হয় না। রাজ কুমার হিরানি তার প্রত্যেক সিনেমায় একটা নতুন গল্প বলার চেষ্টা করেন; এবং এখন পর্যন্ত তার প্রত্যেকটা সিনেমাতেই (মুন্না ভাই এমবিবিএস, লাগে রাহো মুন্না ভাই, থ্রি ইডিয়টস) তিনি সফল হয়েছেন। প্রত্যেকটা সিনেমায় ব্যবসা-সফল এবং ক্রিটিকদের বাহবা পেয়েছে। লক্ষী এবং সরস্বতীর এমন সমন্বয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে তুলনারহিত। ফলে পিকে সিনেমাতেও দর্শকরা তেমনই কিছুর আশা করেছে এবং বলতে হয় এই পিকেতেও রাজ কুমার হিরানি আসলে সফল। কিন্তু এই যে 'আসলে সফল' বলা এখানেই হিরানির কোথাও যেন একটা ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে। ব্যবসা সফল হওয়ার পরেও তাঁর পেছনের যে তিনটা সিনেমা সর্বস্তরে সফলতা কুড়িয়েছিল তেমন সফলতা পিকে পাবে কিনা তার একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। হিরানির জন্য যা নতুন একটা ব্যাপার নিশ্চয়ই।

পিকে সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আমির খান। সে এলিয়ান। ভিনগ্রহ থেকে রাজস্থানে এসে পড়ে। যে ডিভাইসের মাধ্যমে সে ফিরে যেতে পারবে তা হারিয়ে ফেলে আর সেটা উদ্ধার করতে সে শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার শরণাপন্ন হয়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার শরণাপন্ন হতে গিয়ে দেখে এই সব ধর্ম ব্যবসায়ীদের কথা ও কাজের নানান অসঙ্গতি। আর এইসব অসঙ্গতি ধরতে তার সাথে যুক্ত হয় জগৎ জননী অর্থাৎ আনুশকা শর্মা। আনুশকা রিপোর্টার। সে একটা মুসলিম ছেলেকে ভালো বাসতো। কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীর কথায় তার বাবা সেই মুসলিম ছেলেকে মেনে নিতে পারেন না। ধর্ম ব্যবসায়ী জানায় সেই ছেলে ধোকা দেবে। আনুশকা শর্মাও ঘটনাচক্রে ধোকার কথাটা বিশ্বাস করে ফেলে। পিকে নিজের সেই ডিভাইস যেমন উদ্ধার করে তেমনি আনুশকাকেও তার ভুল ধারণা থেকে মুক্ত করে। এবং পিকে নিজে জগৎ জননীকে ভালোবেসে ফেললেও নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে জগ্গুর আসল ভালোবাসাকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। তারপর পিকে চলে যায়। এই মোটামুটি গল্প। গল্প বলা হয় জগৎ জননীর পয়েন্ট অব ভিউ থেকে। পিকের গল্প শোনাচ্ছে জগ্গু, সেই গল্পের ভেতর পিকে আবার তার নিজের গল্প শোনাচ্ছে-- ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফ্ল্যাশব্যাকে দর্শকেরা যেন উড়ে যেতে থাকে। কিন্তু তাতেও গল্পের খামতি থেকে যায়। আমির খান যে গ্রহ থেকে এসেছে তা স্বাভাবিকভাবেই সিনেমায় দেখানো হয় নি। আমির খান সেখানে কী করতো, কে রয়েছে তার, কেমন তার জীবন যাপন এসবের কিছুই আমরা জানতে পারি না সিনেমাটা দেখে। শুধু জানতে পারি সেই গ্রহে তারা নেংটো হয়ে থাকে। ফলে আমির যখন নিজের গ্রহে ফিরে যাবার আকুতি প্রকাশ করে, ইমোশনাল হয়ে যায়, সে আবেগ তখন আমাদের স্পর্শ করে না। পিকের ব্যাকস্টোরি না জানার কারণে তার প্রতি আমাদের কোনো সিমপ্যাথি তৈরি হয় না। তার কান্না এবং তার কান্না কান্না সংলাপ আমাদের কাঁদায় না। ফলে যে গ্যাজেট খুঁজে পাওয়া নিয়ে এই গল্পের কাঠামো তৈরি তা দারুণ রকম ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে।

আরেকটা মুস্কিল হচ্ছে পিকের গল্প কোথাও স্থির হয় না। কোথাও জমাট বাঁধে না। এই তার গ্যাজেট হারালো, এই সে ভাষাহীন, এই সে অন্যের হাত ধরে ভাষা বোঝার চেষ্টা করছে আবার সঞ্জয় হাত ধরে ভাষা বোঝার চেষ্টা না করে পিকে কেন শুধু মেয়েদেরই হাত ধরতে চাইছে তা গল্পে স্পষ্ট হয় না-- ফলে হাত ধরা নিয়ে ভালো কোরিওগ্রাফের একটা গান থাকলেও তা আরোপিত মনে হয়। মনে হয় লেখক পরিচালক চেয়েছেন বলেই এমনটা হচ্ছে, গল্পের প্রবাহে ঘটছে না। একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে কিন্তু ঘটনাগুলোর যে উদ্দেশ্য তা জোরালো না হওয়ার কারণে কোনো ইম্প্যাক্ট না ফেলেই মিলিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমরা ধারাবাহিক কিছু মন্তাজ দেখে যাচ্ছি আসলে।

রাজ কুমার হিরানির অন্য সিনেমাগুলোর সাথে তুলনা করলে পিকের সংলাপে ভার বেশি। হিরানির সংলাপ সাধারণত হাস্যরসে ভরপুর থাকে, এই সিনেমাতেও তা আছে, কিন্তু বিষয় হিশেবে ধর্মকে বেছে নেয়ার কারণে অনেক জায়গায় লেখক পরিচালককে সাবধান থাকতে হয়েছে। সে সাবধানী মনোভাবটা সংলাপেই সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক বেশি এক্সপ্লেনেশনের কারণে সংলাপগুলোতে তুলনামূলভাবে জড়তা এসেছে বেশি। হিরানি অন্য সিনেমার গান্ধিগিরি, জাদু কা ঝাপ্পি, আল ইজ ওয়েল এই ধরনের পাঞ্চের মতো এই সিনেমাতেও 'রঙ নাম্বার' এর পাঞ্চ রাখার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে হয় না এই পাঞ্চটা ওইগুলোর মতো জনপ্রিয় হতে পারে। বরং 'লাভ ইজ ওয়েস্ট অব টাইম' পাঞ্চটি এবং থিমটি অধিক জনপ্রিয় হবার সম্ভাবনা রাখে। কিন্তু এই পাঞ্চ খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না সিনেমায়। আসলে ভালোবাসার দিকটা খুব বেশি উন্মোচিতই হয় না গল্পে। ফলে দর্শক কিছুটা হতাশ হয়ে যেতে পারে।

কেউ কেউ বলছেন পিকে ভালো কারণ সিনেমাটাতে ভালো ম্যাসেজ আছে। হয়তো ভালো, কিন্তু ম্যাসেজের জন্য আর সিনেমা দেখতে বসা কেন? টক শো দেখলেও তো ম্যাসেজ পাওয়া যায়। যে সিনেমায় কিচ্ছু পাওয়া যায় না সে সিনেমাতেই ম্যাসেজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আমির নিজে দাবী করেছেন পিকেতেই তিনি তার সেরা অভিনয়টা করেছেন। এটা শুনে আমাদের আগ্রহ আরে বেড়েছিল। কিন্তু সিনেমাটা দেখতে দেখতে মনে হলো হয় আমির নিজের সিনেমা দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন-- তার আবার 'সারফারোশ', 'লাগান', 'রঙ দে বাসান্তি' বা হালের 'তালাশ' দেখা উচিত। এমনকি 'থ্রি ইডিয়ট'ও দেখতে পারেন। পিকের অভিনয় ওই সব সিনেমা থেকে ছাড়িয়ে গেছে বলে আমাদের মনে হয় নি। তবে সিনেমাটা দেখতে দেখতে এও মনে হচ্ছিল আমির হয়তো অভিনয় নিয়ে ওরকম কথা বলেছেন নিতান্তই ব্যবসায়ী উদ্দেশ্য থেকে।

নাম পিকে হলেও সিনেমাটার গল্প এক সময় আনুশকা শর্মার হয়ে যায়; এবং শেষ পর্যন্ত তারই থাকে। সিনেমার একেবারে শেষের অংশে, এক বছর পরের দৃশ্যে পিকেকে পৃথিবীতে আবার ফিরিয়ে এনে চমক ও তাকে প্রটাগনিস্ট বানানোর উদ্ভট চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তা চমকেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। পিকে আর কখনোই পিকে চরিত্রের গল্প হয়ে ওঠে নি।

আসলে রাজ কুমার হিরানি বলিউডের জনপ্রিয় ফর্মুলা দিয়েই হেঁটেছেন। সিনেমায় তাই সৃষ্টিকর্তার অস্বিত্বে প্রশ্ন না করে আপাত সহজ ধর্মব্যবসায়ীদের টার্গেট করেছেন। ভারতীয় সিনেমার দর্শক কিছু দিন আগেই অক্ষয়-পরেশ রাওয়ালের 'ও মাই গড' সিনেমাটা না দেখলে এই টার্গেট হয়তো আনকোরা লাগতো, কিন্তু তা আর হয় নি। ইন্ডাস্ট্রিতে এমন গুজবও আছে যে পিকের প্রযোজক-পরিচালক 'ও মাই গড' সিনেমার পরিচালককে মোটা অঙ্কের টাকা সেধেছিলেন সিনেমাটা বন্ধ রাখার জন্য। আমরা সে সব গুজবে কান না দিয়ে বরং চোখ রাখি পিকের বলিউডি ফর্মুলায়। সিনেমার শুরুতে সঞ্জয় দত্ত আর শেষে রানবীর কাপুরের ছোট্ট উপস্থিতির চমকও ওই ফর্মুলার কথাই মনে করিয়ে দেয়। বলিউডের আরেকটি জনপ্রিয় ফর্মুলা হলো কেউ একজন এসে কারো ব্যক্তিগত সমস্যা দূর করে দেবে। পিকেতে যে কাজটি আমির আনুশকার জন্য করেন। এই ফর্মুলায় প্রচুর সিনেমা আগে হয়ে গেছে, পরেও হবে নিশ্চয়। অবশ্য ফর্মুলা খারাপ কিছু না। এমন অনেক সিনেমা রয়েছে যা ফর্মুলায় তৈরি কিন্তু ভালো।

নতুন কিছু না দিলেও পিকে নিঃসন্দেহে ভালো সিনেমা, তবে সত্যটা হলো পিকে আসলে রাজ কুমার হিরানির এখন পর্যন্ত বানানো সবচেয়ে খারাপ সিনেমা॥




পিকে
লেখক- অভিজাত জোশি, রাজ কুমার হিরানি
পরিচালক- রাজ কুমার হিরানি
অভিনয়- আমির খান, আনুশকা শর্মা, সঞ্জয় দত্ত, সুশান্ত শিং রাজপুত, বোমান ইরানি।

ছবি- গুগল

মেঘ না হয়ে ঘুড়ি




একটা সবুজ মাঠ। শেষ হলে লম্বা বালুর ঘাট। শেষ হলে নদী।

নদীটা তাহলে বেঁচেই আছে। গতবার যখন দেখি তাকে, স্বপ্নে, মনে হয়েছিল মরে যাবে। ধুঁকছিল। আজও দেখি বেঁচে আছে। নদীর আশ্চর্য তবে জীবনিশক্তি।
হাঁটতে হয় না। ভেসে যেতে পারি আজকাল। এমনকি ভাসলে তেমন খারাপও লাগে না আর। আগে ভাবতাম, নদীতে সাঁতার কাটতে যেমন লাগে-- একটা ক্লান্তি তেমন কিছুও লাগতে পারে এই ভাসাভাসিতে। আদতে লাগে না। তারপর আগে ভয় হতো খুব-- ভাসলেই ভাবতাম পড়ে যাবো। আর পড়ে গেলে --আর কি-- মরে যাবো। মরে যেতে ভয় হতো। খালি নিচের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ওই ম্যাচবাক্সের মতো ঘর আর বাড়ি, সাপের খোলশের মতো নদী... ভয় হতো মরে গেলে এভাবেই যদি ভেসে থেকে যাই! শেষে মেঘ হয়ে যাই যদি?

এখন মরার ভয় নেই আর। ভয় যে নদীটা যদি মরে যায়! কিন্তু নদীটা এখনো চলমান। নদী ভেসে যায়। আমি ভেসে যাই। একটা ইচ্ছা-নাড়ি তবুও মাটিতেই থাকে পোঁতা। ফলত মেঘ না হয়ে আমি ঘুড়ি হয়ে যাই ॥


শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৫

বাংলাদেশ ক্রিকেট দল


.
তিরিশ বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি ক্রিকেটের পথে
ইডেন গার্ডেন থেকে লর্ডসের অতিকায় মাঠের ভিতরে
অনেক ঘুরেছি আমি; অস্ট্রেলিয়ার শ্লেজের শ্লেষার জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; পাকিদের সুইঙের পুরোনো লাহোরে;
আমি ক্লান্ত দর্শক এক, চারিদিকে ক্রিকেটের বিলাস বিফল
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।
রান তার চুরমার বেশুমার ছয়–চার ভরা
বল তার ঘূর্ণনের কারুকার্য; নাতিদূর উইকেটের ’পর
ব্যাট হাতে যে ব্যাটারের চোখ ছানাবড়া
সবুজ ঘাসের পিচ যখন সে চোখে দেখে 
হাজার দর্শকের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে হুংকারে, 
বলেছে সে, ‘কোথায় ছিলিরে পাগল?’
লাল-সবুজের ঝান্ডা উড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।
সমস্ত খেলার শেষে শিশুদের হাসির মতন
জয় আসে; উল্লাসে উল্লাসে ভেসে যায় সারা দেশ;
‘কাপ’ দেয়া হয়ে গেলে প্রতিপক্ষ পালাবার করে আয়োজন
সমস্ত বাংলায় শোর ওঠে ‘শাবাশ বাংলাদেশ!’
সব ছেলে হয়ে যায় রহিম-সাকিব-মাশরাফিতে অদল-বদল
থাকে শুধু ক্রিকেটার, মুখোমুখি বসিবার বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।

(জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতা অবলম্বনে)
[ রস+আলোয় প্রকাশিত]
লিংক:

২০১৫




তুমি আর কী
তবু তোমাকে একটু দেখি
ঢুকে গেছো ঘরে
কোনো অনুমতি ছাড়া
একটা শূন্য বাতাসের মতো
যেন রেখে আসা ভালোবাসা আর তুমি তার
বিষণ্ণতার জের

আর তোমারও আগে যারা এসেছিল
পুরনো বান্ধবির মতো
বলেছিল সেবা দিয়ে সারাবে সকল ক্ষত
আমি প্রতিটি ঘায়ের মুখ খুলে দিয়ে
বসে বসে দেখেছি তাদের হাসি
বিদ্রুপের মতো ডেটলের ঘ্রাণ
এখনো আমার বালিশে ঘুমায়

তুমি আর করবেটা কী
ক্ষতে ভরা এই ক্যানসার দেহে
কামড় বসানোর কোনো স্থান নেই বাকী

অথবা চুমুর


..............................
০১.০১.২০১৫

শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

তাদেরও একটা প্রেমকাহিনি ছিল


তার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল দুপুরে। অথচ কথা ছিল সকালেই দেখা হবার। হয় নি। হয় নি আমার খেয়ালেই। আমি যাই নি।

যাই নি কারণ আমি ভেবেছিলাম সে আসবে না। আসবে না ভাবার অনেক কারণ ছিল। আমার মতো এক ছেলের সাথে কেন তার মতো মেয়ে দেখা করবে তা আমার মাথায় ঢোকে নি। ফলে তার আর আমার যে কমন বন্ধু, স্নেহা, তার কথা আমি বিশ্বাস করি নি। ভেবেছিলাম সে ফাজলামি করছে। সুন্দরী মেয়েরা অসুন্দর ছেলেদের নিয়ে নানা হৃদয়বিদারক ফাজলামি করে-- এরকম কথা হুমায়ূন আহমেদ বইয়ে বইয়ে বলেছে; যেহেতু আমি অসুন্দর কিছুটা ছিলাম কিন্তু তারোধিক সুন্দর ছিল স্নেহা; ফলে এইসব কথা খুব মনে রাখতাম। বন্ধু হলেও আমি স্নেহার সৌন্দর্য ভুলে থাকতে পারতাম না। সে কেমন কেমন করে জানি কথা বলতো, মনে হতো কথায় কোমল স্নেহ মাখিয়ে দিচ্ছে, উড়িয়ে দিচ্ছে কথা, ঘুরিয়ে দিচ্ছে কথা। আর আমার হৃদয়ের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে। আর তার বাহু থেকে গ্রীবা থেকে চিবুক থেকে আলাদা আভা ছড়াতো। বুঝতাম ওইটাই রূপ। ওইটাই সৌন্দর্য। স্নেহা সুন্দর, তাই জানতাম সে আমাকে নিয়ে অনেক ফাজলামি করতে পারি, করতেই পারে। এসব ছিল নিপাতনে সিদ্ধ। আমি স্নেহার সকল হৃদয়বিদারক ফাজলামি হাসিমুখে মেনে নিতাম। সেদিনও নিয়েছিলাম।

তখন এমন মোবাইল কিন্তু ছিল না। আমি নাইনে উঠেছি মাত্র। এত বেশি ভাবতেও পারি না। স্নেহা বলে, যেও তুমি। ও কিন্তু আসবে ওই নদীর পাড়ে, ঘাটের যে সিঁড়ি শেষ হয়ে যায় আর ভাঙা একটা পাড় থাকে, ওখানে সে বসে থাকবে... তুমি যেও...

তখনও বান্ধবীরা তুই বলা ধরে নি। আর আমি তো এখনো বলতে পারি না। আমি তাই তোতলাতে তোতলাতে বলছিলাম, ক্যান, ওখানে আসবে ক্যান?
স্নেহা চোখ পিটপিট করে বলেছিল, তা তো সে-ই বলতে পারবে... আমি কী জানি? কিন্তু কী জানি কথা আছে তার তোমার সাথে?

চিন্তায় আমার কপালে ভাঁজ পড়ে। আমার সাথে কথা? তার? অসম্ভব। কোনো মেয়ে আমাকে গোপনে কোনো কথা বলতে পারে তা আমার ধারণারও বাইরের ব্যাপার। আমি তাই ফেলুদা হই। বলি, স্নেহা ক্যান মিথ্যা বলছো?

স্নেহা ব্রু কুচকে ফেলে। বলে, মিথ্যা? তো ঠিক আছে... মিথ্যা তো মিথ্যা... না গেলে যাবা না...!

স্নেহা চলে যায় সন্ধ্যাটা করুণ করে। আর আমার একটা রাত নির্ঘুম কাটে। যারা জেগে রাত কাটাতে পারে না তারা জানে নির্ঘুম রাত কী দুঃসহনীয় হয়। বিছানায় শুয়ে ছটফট আর বারবার পাশ ফেরা। বুকের কাছে কাঁথা টেনে নেয়া আর বারবার ফেলে দেয়া। মনে হয় এই রাত কবে হবে শেষ!

শেষ হয়। ভোর হয়। আজান শোনা যায়। বাড়ির লোক কেউ কেউ ওঠে। কলপাড়ে পানি তোলার শব্দ হয়। ঝাঁট দেয়ার শব্দ। শুকনো পাতা গড়িয়ে যাবার শব্দ। সব শব্দ একেবারে কানের ভেতর বারুদ জ্বালায়। কিন্তু আমি উঠি না। আমার ক্লান্তি লাগে। স্নেহা বলেছে আজ সেই ঘাট শেষে সিঁড়ির কাছে নদীর পাড়ে যেখানে শরতে আসলে দেদার কাশফুল ফোটে আর নৌকাগুলো বেঁকে যায় সেখানে সে আসবে... আমার সাথে দেখা করতে চায় সে... আমাকে কী যেন বলবে...

বিশ্বাস হয় না। সুন্দরীর ফাজলামি ভেবে শুয়ে থাকি অনেকক্ষণ। স্কুল ফাঁকি। পড়ার কোনো তাড়া নেই। আমি শুয়ে শুয়ে ভাবি। যদি সত্যিই আসে। ভয় হয় খুব। বুক ঢিব ঢিব করে। আমি যাই না। যেতে আমার সাহস হয় না। কিন্তু যাবার ইচ্ছাটাও থাকে। মনে হয় স্নেহাকে গিয়ে ডাকি। এই তো দুঘর পরেই বাড়ি। ডেকে বলি তুমিও চলো না আমার সাথে।

কিন্তু স্নেহাকে ডাকতেও ভয় হয়। আমার সকালটা কেমন চিনিহীন পায়েসের মতো হয়ে যায়। আম্মা বলেন, কীরে কী হয়েছে তোর? মুখ এরকম কেন?

আমি মুখ আরো শুকিয়ে ফেলি। বাড়ির ভিতরে প্রেতের মতো হাঁটি। যেন আমি আছি, কিন্তু আমি নেই। যেন ঘরের দেয়ালগুলো ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। আবার ঢুকে যাচ্ছি।

স্নেহা বলেছিল, খুশি আমাকে দেখেছে এই তো কদিন আগে। গার্লস হাই স্কুলের সামনে যেদিন ক্রিকেটের ব্যাটটা নিয়ে গেছিলাম, বল খোঁজার নামে, আসলে একটা ভোঁ চক্কর দেয়ার ইচ্ছায়। খুশি আমাকে আগে দেখে নি কারণ খুশিরা এসেছে বদলি হয়ে এই মাঝ বছরে। আর দেখেই নাকি...

স্নেহা এমন বদ, সবটা বলে না। খালি মুচকি মুচকি হাসে। কিন্তু খুশি আমাকে ডাকে কেন? নাকি খুশির কথা শুনে আমার চোখে কোনো চমক দেখে স্নেহা এমন একটা ফাঁদ পেতেছে। সেখানে গিয়ে হয়তো দেখা যাবে স্নেহারাই বসে আছে। আর আমাকে হাতেনাতে ধরে খুব হৈহট্টা করছে। নাহ, যাবো না!

না, যাবো না বলেও কিন্তু যাই আসলে। তবে সেটা বেলা গড়িয়ে। সকালটা পেরিয়ে। ঝা দুপুরে। একটা টিশার্ট আর সবচেয়ে ভালো যে প্যান্ট সেটা পরে। মুখে বড় আপার ফেয়ার এন্ড লাভলিটা লুকিয়ে মেখে। গিয়ে শেষ সিঁড়িটার ওখানে দাঁড়াই। উঁকি দিতেই দেখি পনিটেল। ধক করে ওঠে বুক।

সত্যি খুশি... সত্যি?

মুখ ফিরিয়ে আছে। তার পিঠে স্কুলের নিল কামিজ ঢিলঢিল করছে। ভেতরে সাদা। ওড়না সাদা। তাহলে সত্যি? আমার গলা কেঁপে যায়... ডাকি, খুশি...?
খুশি ঘুরে তাকায়। আর তার কোলের কাছ থেকে, হঠাৎই একটা সাদা বেড়ালছানার মতো বেরিয়ে আসে রঞ্জু। খুশিদের মতোই এইটে পড়ে। আমাকে দেখে খুশি আর রঞ্জু একসাথে বলে, মিঠু ভাই... আপনি?



আমি হাসতে চাই, হাসতে পারি না। কথা বলতে চাই, বলতে পারি না। আমার তখন খুব স্নেহার কথা মনে হয়। যেন সে খুব হাসছে। আর পুনর্ভবা খলবল করে উঠছে। সে হাসিতে আমার রাগ হওয়ার কথা, কিন্তু আমার ভেতর ঝমঝম করছে, মনে হচ্ছে পরিত্যক্ত ওই রেললাইন দিয়ে চলে যাচ্ছে ভারতীয় ওয়াগান। ঝমঝম ঝমঝম!
স্নেহা।

মঙ্গলবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৪

আবু নাসিম বা লখিন্দর কোনোটাই তার নাম ছিল না... (সাত)




সাত.

বাবুভাইয়ের পার্টি মধ্যরাত পেরিয়েও চলেছিল। কিন্তু বাবুভাই চলে যেতেই, যেমন হয় সচরাচর, পার্টিটা ঝিমিয়েও পড়েছিল। মেলা ভেঙে গেলে মাঠজুড়ে যেমন একটা শূন্যতা থাকে, ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, পার্টিটাকে তখন তেমনই মনে হচ্ছিল লখিন্দরের। আর তার ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো ভিজে গিয়েছিল ঘামে। লখিন্দর ঘাম শুকাতে একটা প্রকাণ্ড এসির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের পাত্রের দিকে মন দিয়েছিল। কিন্তু চোখের কোণা দিয়ে সে, হয়তো অকারণেই খেয়াল রাখছিল রঞ্জনাকে।

বাবুভাই চলে গেলে রঞ্জনাও নড়ে ওঠে। একটা মুহূর্তের জন্য সে তাকিয়েছিল লখিন্দরের দিকে। সে দৃষ্টিতে কী ছিল, লখিন্দর চোখপড়া মানুষ হলেও ঠিক ধরতে পারে নি। তারপর এক পা এগিয়ে আমান খানের দিকে এগিয়ে যেতে গিয়েও রঞ্জনা থমকে যায়। বলা যায় ছুটেই বেরিয়ে যায় সে। তার যাওয়াটা দেখে লখিন্দর। লখিন্দরের মনে হয় একটা বর্শা, তার সমস্ত গতি নিয়ে বেরিয়ে গেল, যেন আঘাত করবে লক্ষ্যকে। কিন্তু রঞ্জনার লক্ষ্য কী তা নিয়ে ভাবলো না লখিন্দর। এসব ভাবনা তার কাছে কখনোই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় নি। অথচ, আমরা এখন ভাবি, লখিন্দরের উচিত ছিল এসব ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়া। যদি দিতো, আমরা মনে করি, লখিন্দরের প্রলম্বিত ছায়াটিকে এখন আমাদের আমান খানের মতো মনে হতো না। মনে হতো না বারান্দায় বসে মার্টিনি শুষে নেয়া লোকটি দীর্ঘ প্রলয় পেরিয়ে আসা লখিন্দর... যে হারতে হারতে জিতে যেতো প্রায় অলৌকিক উপায়ে। আর আজ সে যেন হেরেই বসে আছে। অপেক্ষা করছে বিজয়ীর। আর তার পানির ট্যাঙ্কের ভেতর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রঞ্জনা... ঘুমাচ্ছে বা জেগে আছে বা আসলে মরে গেছে! আমরা কোনোভাবেই রঞ্জনার এই পরিণতির কথা ভুলতে পারি না। ভুলতে পারি না লখিন্দরের এই নিষ্পৃহতা। রঞ্জনার ঠোঁটের কোণের রক্তবিন্দুগুলো ট্যাঙ্কের পানিতে ধুয়ে ধুয়ে যায়। ট্যাঙ্কের পানি দূষিত হয় ঠিকই কিন্তু তার অধিক দূষণ আমাদের মনে জমে যায়। আমরা দূষিত মন নিয়ে, দুর্ভার নিয়ে করুণা করেই যখন লখিন্দরের দিকে তাকাই, দেখি এসির সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে শুকিয়ে নিচ্ছে আমরা বিচলিত হই। ভাবি, হায় লখিন্দর... শরীর শুকানোর সাথে তুমি যদি তোমার মনটাও শুকিয়ে নিতে... যদি আরো একটু স্পষ্ট দেখার কথা ভাবতে তাহলে জানতে পারতে কী নিদারুণ এক ষড়যন্ত্র তোমার বিরুদ্ধে রঞ্জনার ওই দুধেল বিছানায় রচিত হচ্ছে। কামে আর ক্রোধে, গর্জনে আর বিসর্জনে, ভালোবাসায় আর ঘৃণায় গোখরার সহবাসের মতো লেপটে লেপটে রচনা হচ্ছিল লখিন্দরকে তার উচ্চতা থেকে এক টানে একেবারে অন্ধখাদে নামানোর এক ভয়াল ষড়যন্ত্র। আমরা সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে, যদিও দৃষ্টি দেয়াটা আমাদের উচিত হয় নি, আমরা শিউরে উঠি। থরোথরো কাঁপি। ভাবি তাহলে এই তো মানুষ আসলে। একটা শিশু যা নিয়ে আসে... ক্ষুধা আর তৃষ্ণা, হিংসা আর ঘৃণা, টিকে থাকবার নিদারুণ অভিপ্রায় আর তার বড় হওয়ার সাথে সাথে তার ভেতর যুক্ত হয় কাম... এই তো মানুষ... এর বাইরে তো সে কিছু নয়। এর বাইরে যা-কিছু ভালোবাসা আর বিনয়ের প্রলাপ তা তো এই সভ্যতার হাতুরি... এরাই মানুষ, যারা রঞ্জনার ওই দুধেল বিছানায় সঙ্গমরত, ষড়যন্ত্ররত, টিকে থাকবার বাসনারত... মানুষ তো এর বাইরে কিছু নয়। আমাদের দেখাটা তখন সত্যিকারের দেখা হয়ে ওঠে। আর আমরা ভাবি লখিন্দরও যদি এই দেখাটা দেখতে পেতো। বারবার ভাবি, যদি দেখতে পেতো যদি শুনতে পেতো... আহা যদি পেতো!

কিন্তু পৃথিবীর কিছু নিয়ম তো আছে। যার যখন যা দেখার শোনার জানার কথা, তার বাইরে, সে কখনোই তা দেখতে শুনতে জানতে পারে না। এই নিয়ম কে বানিয়েছে এমন ভেবেছে লখিন্দর খুব। আর এমন ভাবতে হাস্যকরভাবে তার শুধু শৈশবের আঁকা এক চোখঅলা দৈত্যের কথা মনে হয়েছে। দৈত্যটার শরীর মোটা আর থলথলে। একটা মাত্র চোখ আর সাথে মহিষের মতো একাকী শিং। আর এই এসির বাতাস খেতে খেতে তার মনে হলো সেই দৈত্যটা আসলে আমান খান। কিন্তু আমান খানের চোখ আছে দুটি-- পরক্ষণেই ভাবে লখিন্দর-- দুটি নাকি আসলে একটি? আর সারাক্ষণ ঢেকে রাখে সেই চোখ-- একটা গাঢ় সানগ্লাশ দিয়ে। লখিন্দর একবার আমান খানকে নিয়ে ভাবার চেষ্টা করল তখন, কিন্তু তার ভেতরেও হুইস্কির একটা ভোঁদৌড় আছে। মনে হচ্ছিল একটা রকেটবাজি সা করে একবার মাথায় একবার তার পায়ের কাছে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। ফলে লখিন্দর একবার বমির কথা ভাবতে পারে, আর বড় জোর ভাবতে পারে পার্টিটা ছেড়ে চলে যাবার কথা।

কিন্তু যাবার কথা তখনো ভাবে নি আমান খান। আমান খানের নেশাটা একেবারে সপ্তমে। কিন্তু রঞ্জনাকে এমন বেরিয়ে যেতে দেখে তার ভ্রু কুচকে গিয়েছিল। বাবুভাই যে জ্বালাটা রেখে গিয়েছিলেন তা তার ভেতরে ছিল, তার দহনও ছিল ধিকিধিক, কিন্তু তাই বলে রাতটাকে তার শুষে নিতেও ইচ্ছা করছিল। আর ওই শোষণের ভেতর এক অদ্ভুত লকলকে বাসনা জাগ্রত হচ্ছিল তার। বাসনা কখনো কখনো নতুন ওই মেয়েটা, যার একটি ফিল্ম বেরিয়েছে, যার নাম দেয়া হয়েছে চুমকি, তার খোলা পিঠের কাছে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছিল। আমান খানের চোখ লাল হয়েছিল নিশ্চয়, কিন্তু গাঢ় সানগ্লাসের ভেতর দিয়ে তা দেখার উপায় ছিল না। যেমন উপায় ছিল না ওই লকলকে লালসার চেহারাটা দেখার। মেয়েরা নাকি আগে থেকেই এসব টের পায়-- চুমকি হয়তো তাই বেশ কয়েকবার আমান খানের সামনে দিয়ে ঘুরে গেছে। আর আমান খানের ভেতরের লবঙ্গের ঘ্রাণতোলা ধূসর ফলাটা ফুঁসে ফুঁসে উঠেছে। দীর্ঘ সময় মদ্যপান করলে আমান খানের মাঝে মাঝে এমন হয়। সে বাসনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করে। কিন্তু এই বাসনা আর চুমকির মাঝে ছিল রঞ্জনার মতো এক শক্ত ও লম্বা দেয়াল। আমান খান তাতে আরো উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। কিন্তু রঞ্জনা চলে গেলে, দেয়ালটা সরে গেলে, হঠাৎ সব স্তিমিত হয়ে পড়ে। যেন বাতাসভর্তি একটি বেলুন, একটা পিনের আঘাতে, হঠাৎ করেই চুপসে গেল। আমান খানের হৃদয় এবং ধূসর ফলা যেন নিমিষেই ঘুমিয়ে পড়তে চায়। আর আমান খানের একটা হাই ওঠে। হাই উঠলে আমান খান সাধারণত একটা চুটকি বাজায়, কিন্তু আজ বাজাতে ইচ্ছা করল না তার। বরং কেমন একটা ঘোরলাগা চোখে রঞ্জনার যাবার পথটা দেখতে থাকলো। চুমকি তখন আরো একবারের মতো আমান খানের কাছে এসেছিল, একটা দুর্দান্ত ঘ্রাণ আমান খানের নাক দিয়ে হৃদয়ে যেতে চায়, কিন্তু আমান খানের দরজা-কপাট সব যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর কোনো কিছুই তার ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। আর ভেতর থেকে কোনো কিছুই আর বাইরে আসতে চায় না!

তাহলে বাধাই কি আমান খানের বাসনার উৎস ছিল? আমান খান এসব ভাবে না, বরং তার ভেতর একটা শঙ্কা জন্ম নেয়-- রঞ্জনা কোথায় যাচ্ছে? চলে যাচ্ছে? একা যাচ্ছে? আমান খানকে ছেড়েই? তাহলে কি এত সাহস সে পেয়ে গেল এই এক লহমায়? পেয়ে গেল ওই লখিন্দরের সাথে কয়টা ফিল্মের কথা শুনেই? বাবুভাইয়ের ছায়াই কি এখন তার কাছে সব? আমান খান আর কিছু নয়? সুপারস্টার আমান খান তাহলে আর কিছু নয়?

ক্রোধ হয় আমান খানের। তাকে না বলে রঞ্জনার এই চলে যাওয়া তাকে বিক্ষত করে তোলে। সে তার গ্লাশটা মেঝেতে ছুঁড়ে মারে। শব্দ তো হয় কিছুটা। কিন্তু ঘরভর্তি যে মানুষ তাদের কাছে এই শব্দের তেমন কোনোই গুরুত্ব নেই। কাচ কিছুক্ষণ পরপরই ভাঙছে হেথায়--- এখন মধ্যরাতের পর কেউ কারো কথা শুনবে না, কিছুক্ষণ পরপর কাচ ভাঙবে এমনই তো নিয়ম!

কিন্তু ওই কাচভাঙাটা বেশ খেয়াল করে লখিন্দর। বমির কথা ভুলে যায় সে। একটা মুচকি হাসি কি তখন তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে? এই এত আঁধার আর এত লালনীল আলোর ঝলকানিতে ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু মনে হয়, হাসি অথবা একটা কিছু, লখিন্দরের ঠোঁটে ফুটে ওঠে ঠিকই। তাতে, আমাদের চেনা পরিচিত লখিন্দরকে, ভয়ানক দেখায়। মনে হয় এ কোনো গ্রামীণ হিরো নয় বরং হলিউড সিনেমার ঠাণ্ডা মাথার ভিলেন। আর আমাদের তখন খুব আশ্চর্য লাগে। তাহলে নায়কও কখনো কখনো ভিলেন হয়ে উঠতে পারে? আমাদের খুব ঘোর লাগে, অস্থিরও লাগে-- আমরা সুবোধ নায়ক চাই, প্রতিবাদী নায়কও চাই, কিন্তু হ্যাপি এন্ডিং আমাদের দাবী। আর সেই হ্যাপি এন্ডিং-এ নায়ক যেন নায়ক থাকে। নায়ক যেন ভিলেন না হয়ে ওঠে। আমরা নায়ককে নায়ক হিশেবেই চাই, সবসময় চাই! দেখি লখিন্দর এগিয়ে যায় আমান খানের দিকে। হয়তো নায়ক বলেই যায়। একটু ধীর পায়ে। যেন সঞ্চিত শক্তিটা তেমনভাবে খরচ করতে চায় না। আমান খান তখনো ওই ভাঙা কাচ টুকরোগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। সেগুলোর ওপর লখিন্দরের ছায়া পড়লে আমান খান মুখ তোলে। লখিন্দরকে দেখে তার ভ্রুয়ের মাঝে একটা দাগ তৈরি হয়। লখিন্দর বলে, আপনি ঠিক আছেন তো?

গালি দিতে চায় আমান খান। বলতে চায় শুয়োরের বাচ্চা আমি কেমন আছি তাতে তোর কি... কিন্তু আমান খান বলে না। আমান খান ভালো অভিনেতা বলেই না এই এতদিন ধরে সুপারস্টার। নিজেকে সামলে নিতে তাই তার সময় লাগে না। গালির বদলে লখিন্দরকে হাসি দেয় আমান খান। বলে, আমি ঠিক আছি। তবে তুমি ভালো থাইকো...

শেষের শব্দটা বলার সাথে সাথে পা চালায় আমান খান। বেরিয়ে যায়। টলমল নয়, একেবারে দাপুটে পায়ে। যেভাবে সে এতকাল এই ঢাকাই ফিল্মে চলেছে। খটখট আওয়াজ তুলে। লখিন্দর সে যাওয়াটা দেখে। নায়কের আসা আর যাওয়াটাই মুখ্য সিনেমায়-- এমনকি জীবনেও, লখিন্দর এমন ভাবে। এবং নিজেকে প্রশ্ন করে, বলে, তুমি কি আসতে পেরেছো এখনো? তোমার আসা কি হয়েছে? নাকি তুমি এখনো আসলে অপেক্ষা করছো সেই সত্যিকারের আসার... যে আসাটা ওই আমান খান অর্জন করেছে অনেক অনেক দিন আগেই!

লখিন্দর কোনো উত্তর পায় না ভেতর থেকে। ফলে ভেতরটাকে তার প্রতিপক্ষ মনে হয়। সে প্রতিপক্ষকে জ্বালিয়ে দিতে চেয়ে ঢক করে গেলে আরেক পেগ হুইস্কি। এবং লখিন্দর অপেক্ষা করে প্রতিপক্ষের। আর প্রতিপক্ষ কিছুক্ষণের ভেতরেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। লখিন্দর একবার ওয়াক করে শব্দ করে। তারপর হড়হড় করে করে বের করে দিতে থাকে অর্থহজম খাদ্য ও পানীয়। অচেনা শিরাউপশিরায় খাদ্য ঢুকে পড়ে। আমান খানের ভাঙা গ্লাশের ওপর লখিন্দর বমি করতে থাকে। লখিন্দরের মনে হয় সে মরে যাচ্ছে... আর এমন অনুভূতির ভেতর তার এই প্রথম মনে হয় সে আসলে খুলে খুলে যাচ্ছে। তার ভেতরের সমস্ত দরজা-জানালা-কপাট খুলে যাচ্ছে। লখিন্দর বমির শেষ বিন্দুটি উগড়ে দেয় মেঝেতে। তারপর পকেট হাতড়ে একটা সুগন্ধী রুমাল বের করে সে। সেটা দিয়ে মুখটা মোছে। রুমালটা তার খুব পরিচিত মনে হয়। রুমালের সুগন্ধ তার বমির দুর্গন্ধে ভরে যায়। লখিন্দর একবার হেসে ওঠে। তারপর নিজেকে সামলে নেয়। ফলে আমরা লখিন্দরের দিক থেকে দৃষ্টি ফেরাই। আর আমান খানের গাড়ির ব্যাকলাইট ধরে চলে যাই রঞ্জনার বিছানা পর্যন্ত। যা দেখার আমাদের অধিকার নেই তাই দেখি ফেলি তখন। যা শোনার আমাদের অধিকার নেই তাই শুনে ফেলি তখন। যা জানার আমাদের অধিকার নেই তাই জেনে ফেলি তখন।

কিন্তু আমাদের ভেতর কোনো অপরাধবোধের জন্ম হয় না। বরং মানুষ আর সভ্যতার অসীম দূরত্ব আরেকবারের মতো আমাদের চোখের সামনে উন্মোচিত হয়।

(চলবে...)

ছবি: গুগল চিত্র