মঙ্গলবার, ৯ মে, ২০১৭

একদিন এক ভ্যাটকানো রাস্তায়

অাঁকা: িশখাঅাঁকা: িশখামুসলিম ভাইদের প্রতি সালাম, হিন্দু ভাইদের প্রতি নমস্কার এবং অন্যান্য ধর্মের লোকদের প্রতি আবু মজমাদারের শুভেচ্ছা। আজকে আমি আপনাদের সামনে নিয়া হাজির হইছি আজব এক জিনিস। এই যে আমার কালো ব্যাগ দেখতে পাচ্ছেন ব্রাদার, কী মনে হয়, এর ভিতর কী আছে? কী আছে? জায়গায় দাঁড়ায়া আওয়াজ দেন ভাই, কী মনে হয়, এই ব্যাগের ভিতর আছে কোন সে আজব জিনিস! সাপ নাকি শাপ? ব্যাঙ নাকি ব্যাংক? ভুল করলেন ভাইটি আমার! আকরাব আকরাব! খোল খোল, এই ব্যাগ…খোল! এই যে দেখেন ভাই, ভালো কইরা দেখেন, দেখেন, না, কোনো থলের বিড়াল না এইটা, কোনো রকেট বামও না, দাঁতের মাজনও না এইটা কিন্তু ভাই! কোনো সর্বরোগহারী অব্যর্থ মলমও কিন্তু না! তাইলে কী এইটা? আকরাব! আকরাব!! এইটা হইল ভ্যাট! ভ্যাট!!

এই দাঁড়া…খাড়া এইখানে, কই যাস তুই! এ বড় পিছলা ভাই! খালি হাত থেইকা ফসকায়া যাইতে চায়, আর খালি দৌড়ায় আর বড় বড় লম্ফঝম্ফ দেয়! আমার ওস্তাদ এরে সেই এভারেস্টের গুহার ভিতরে প্রথম আবিষ্কার করছিল! তারপর থেইকা এই ভ্যাট খালি লাফাইতে চায়! ওস্তাদরে বলছিলাম, ওস্তাদ, এই ভ্যাট নিয়া আমরা কী করব? এরে কি অলিম্পিকে পাঠায়ে দিব? এ তো লাফাইতে লাফাইতে বাইড়া যাইতেছে! অলিম্পিকে দীর্ঘ লম্ফে খাড়াইলে নিশ্চয় স্বর্ণপদক পাইব!

ওস্তাদ কী বলছিল, জানেন? ওস্তাদ বলছিল, ওরে নাদান, ওরে আমার পেয়ারের আবু, তুই এখনো এই ভ্যাটরে চিনতে পারস নাই! এরে অলিম্পিকে পাঠানোর দরকার নাই! কী নাই? অলিম্পিকে পাঠানোর দরকার নাই! এরে তুই নিজের কাছেই রাখ। আর বছর বছর সময়মতো তোর কালো ব্যাগ থেইকা বাহির কর! দেখবি, এই ভ্যাট তোর জন্য স্বর্ণপদক না হীরার পদক নিয়া আসবে! হীরার পদক!

তা এই হীরার পদক আনা ভ্যাট দিয়া আপনারা কী করবেন, ভাই? আছে কোনো চিন্তা? এই ভ্যাট কী উপকারে লাগব আপনাদের, ভাবছেন কিছু? ভাবেন নাই। আমি তাইলে কই। বাড়ির গিন্নি-বউ-মা-বোনেরা রান্নায় বেশি তেল দিয়া দিতাছে না? কী, দিতাছে? না দিতাছে না, কন! উত্তর দেন না ক্যান? দিতাছে না? আর সেই বেশি তেল খাইয়া আপনার পেট খারাপ, মন খারাপ, মাথা খারাপ! সারা দিন বস আর পাতিবসদের জি স্যার জি স্যার বলিয়া তেল দেওয়ার পর আর কোনো তেলই আপনার সহ্য হইতেছে না! তেল খাইলেই বদহজম। গ্যাস্ট্রিক আর বদঢেকুর! আর এই সব থেইকা মুক্তির উপায় হইল এই ভ্যাট!

এই ভ্যাট রান্নার ওই তেলের সঙ্গে আমি যুক্ত কইরা দিতাছি! আর দেখেন, তখনই আপনি বাড়িতে বলতে পারবেন তেলের দাম বাইড়া গেছে, তেল খাওয়া নিষেধ! যে কাজ আপনি নিজে এত দিন বইলা করাইতে পারেন নাই, দাম বাইড়া গেছে শুনলেই বাড়িতে তেল খাওয়া দেখবেন অটোমেটিক কইমা গেছে! এখন দরকারি জিনিসের দাম অনেক বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু এই ভ্যাট শুধু কোম্পানির প্রচারের জন্য এইবার মাত্র ১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট!
আপনারা যদি আরও মনে করেন এই ভ্যাট আপনাদের কী কাজে লাগবে, তাইলে ব্রাদার, একটু খেয়াল করেন। আপনার প্রতিদিনের জিনিসপত্রের সঙ্গে এই ভ্যাট লাগায়ে দিলেই আপনার প্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম হাতের নাগালের বাইরে চলে যাবে! তখন কী হবে? কী ভাই, উত্তর দেন না কেন? কী হবে তখন? এই দেশে যখন আপনি আর হাতের নাগালে জিনিস পাবেন না, তখন তা কিনতে চলে যাবেন দেশের বাইরে। একই জিনিস দেশের বাইরে থেকে আপনারা কিনে আনবেন অনেক সস্তায়। সপ্তাহে সপ্তাহে তখন আপনাদের বিদেশ ভ্রমণ নিশ্চিত! কী, আপনারা বিদেশ ভ্রমণ করতে চান না, ভাই? চান কি চান না, বলেন? যাঁরা বিদেশে যাইতে চান, জায়গায় খাড়ায়া আওয়াজ দেন খালি। কোম্পানির প্রচারের জন্য এই ভ্যাট এইবার শুধু ১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট…
এই যে বছরে এতগুলা উৎসব আর প্রতিটা উৎসবে নতুন নতুন জামাকাপড় কিনার হিড়িক। উৎসব আসা মানেই আপনার পকেট থেইকা টাকা পাখির মতো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ কইরা উইড়া যাইতেছে। এইটা যদি বন্ধ করতে চান, তাইলে এই ভ্যাট হইল আপনার জীবনের শেষ চিকিৎসা মানে দ্য লাস্ট ট্রিটমেন্ট! এই ভ্যাট লাগানো মাত্রই আপনাদের পোশাকের দাম এক লাফে লম্বা হইয়া যাবে। আর দাম লম্বা হইলেই আপনার পরিবারের মানুষদের বুঝায়ে বলার সুযোগ পাইবেন আপনি। বলবেন, গত বৈশাখের পাঞ্জাবি এই বৈশাখে প্রয়োজনে শার্ট বানায়ে পরো! আপনাকে আর নতুন জিনিস কিনতেই হইব না, ব্রাদার! আকরাব! আকরাব! এক্সট্রা খরচ থেইকা যে এইবার বাঁচতে চায়, সে জায়গায় খাড়ায়া আওয়াজ দেন খালি। কোম্পানির প্রচারের জন্য এই ভ্যাট এইবার শুধু ১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট…
ভ্যাট! ভ্যাট!! ভ্যাট!!! আছেন কোনো সহৃদয় ব্যক্তি, আছেন? থাকলে জায়গায় খাড়ায়া আওয়াজ দেন! কোম্পানির প্রচারের জন্য এইবার শুধু ১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট…১৫ পার্সেন্ট!!!

বাঘমামা

বনে আর কোনোভাবেই মন টিকছে না বাঘমামার। কোথাও একটু ঘুরতে গেলে ভালো হতো! শেয়াল এসে বুদ্ধি দিল। বলল, ‘ঘুরতে যখন যাবেন তখন রাজধানীতেই যান...মানে ঢাকায়!’
: ঢাকা? কিন্তু আমি তো কিছুই চিনি না।
: কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আপনাকে ট্রেনে উঠিয়ে দেব। পু-ঝিকঝিক করতে করতে আপনি পৌঁছে যাবেন ঢাকায়। ঘুরবেন ফিরবেন খাবেন দাবেন...আরামই আরাম।
সে রাতেই বাঘমামা উঠে গেল ট্রেনে। বসল একটা কামরায়। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাঘমামা বলল, ‘শোনো, বনটা কিন্তু দেখে রেখো। আমি খুব দ্রুতই চলে আসব।’
শেয়াল বলল, ‘কোনো চিন্তা করবেন না। আমি সব দেখে রাখব।’
পোওওও আওয়াজ তুলে ট্রেনটা চলে গেল। আর শেয়ালটা হাসতে হাসতে পৌঁছাল বনে। চিৎকার করে ডেকে বনের সবাইকে বলল, ‘বনের পশুপাখি গাছপালা সবাই মন দিয়ে শোনো...আজ থেকে আমিই বনের রাজা। আমি যা বলব আজ থেকে তা-ই হবে।’
শেয়াল বনের রাজা হবে শুনে পশুপাখিদের খুব মন খারাপ হলো। বাঘমামার মতো কি আর কেউ বনটাকে আগলে রাখতে পারবে?
ওদিকে বাঘমামা নামল ট্রেন থেকে। গভীর রাত। রাস্তায় শুধু হলুদ হলুদ আলো। কিন্তু বাঘমামার পেটে খুবই খিদে। ছটফটিয়ে বাঘমামা ঢুকল এক হোটেলে। বলল, ‘হালুম, খাবার আছে কোনো?’
হোটেলের লোকজন বাঘমামাকে দেখে যে যার মতো দৌড়ে পালাল। শুধু সবচেয়ে ছোট্ট যে সে বলল, ‘বসেন আরাম করে। এখন শুধু কাচ্চি আছে, খাবেন?’
বাঘমামা বলল, ‘কাচ্চি-মাচ্চি যা পাচ্ছি তা-ই খাব!’
ছোট্ট ছেলেটা এক প্লেট কাচ্চি বিরিয়ানি দিল বাঘমামাকে। বাঘমামা হাপুস-হুপুস করে খেলো। তেল একটু বেশি কিন্তু খুব আরাম পেল খেয়ে। তারপর হেলতে-দুলতে গিয়ে শুয়ে পড়ল রাস্তার মাঝখানে। একটা হাই তুলে, থাবা দিয়ে নাকটা একবার চুলকে ঘুমিয়ে পড়ল সেখানেই।
সকালে বাঘমামার ঘুম ভাঙল চিৎকারে। চোখ মেলেই দেখল অনেক মানুষ তাকে ঘিরে রেখেছে দূর থেকে। তারা বলছে, ‘এটা নিশ্চয় চিড়িয়াখানার বাঘ, পালিয়ে এসেছে!’
একজন বলল, ‘কিন্তু একে ধরব কীভাবে?’
আরেকজন বলল, ‘দূর থেকে ইনজেকশন মেরে বাঘটাকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে হবে। তারপরেই ঢুকিয়ে দিতে হবে চিড়িয়াখানার খাঁচায়!’
এসব শুনে তো বাঘমামার মাথা ঘোরার দশা। হালুম বলে লেজ গুটিয়ে সে দিল এক দৌড়। মানুষগুলো ছুটতে শুরু করল তার পেছনে। বাঘমামা আরও জোরে দৌড়াতে শুরু করল—দৌড় দৌড় দৌড়!
দৌড়াতে দৌড়াতে বাঘমামা ঢুকে পড়ল গুনগুনদের বাসাতে। গুনগুন তখন ড্রয়িংরুমে বসে পড়ছিল। বাঘমামা ঢুকেই বলল, ‘আমাকে বাঁচাও। ওরা আমাকে চিড়িয়াখানায় বন্দী করে দেবে।’
গুনগুন একটু ভেবে বলল, ‘শোনো আমি যা বলব তা-ই করবে, ঠিক আছে?’
বাঘমামা মাথা নাড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল, ‘ঠিক আছে।’
একটু পরেই লোকগুলো এল ছুটতে ছুটতে। গুনগুনের পাশেই বাঘমামাকে দেখে বলল, ‘অ্যাই মেয়ে, এই বাঘটাকে দাও। আমরা চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাব!’
গুনগুন তখন ফোকলা দাঁতে হেসেই খুন। বলল, ‘কে বাঘ? ওটা তো আমার বিল্লি!’
: কী বলো, ওইটা বাঘ। দেখছ না ওটার গায়ে ডোরাকাটা!
: ওই ডোরা তো আমিই কেটেছি...কেটে বাঘ সাজিয়েছি।
: না না ওটা বাঘ। হালুম-হুলুম বাঘ।
: না না ও তো বিল্লি। ওর নাম মিনি। মিনি ডাকো তো একবার...
বাঘমামা তখন ডেকে উঠল—মিউ মিউ!
লোকগুলো তো ভীষণ অবাক। সত্যিই তো, এমনভাবে তো বেড়ালই ডাকে। বাঘ হলে তো ডাকত হালুম বলে। লোকগুলো চলে গেল। আর তখনই বাঘমামা আর গুনগুনের বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
আর বন্ধু হলে তো বন্ধুর উপকার করতেই হয়। গুনগুন তাই তার বাবাকে বলে বাঘমামাকে বনে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। ট্রেনে চেপে পরের দিনই বাঘমামা পৌঁছাল বনে। আর বনে গিয়ে দেখল এর মধ্যেই শেয়াল গাছ কাটাচ্ছে, ডাল ভাঙছে, সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে। বাঘমামা রেগে গিয়ে দিল ভীষণ ধমক। যারা গাছের মগডালে বসে ডাল কাটছিল তারা টুপটাপ খসে পড়ল। শেয়াল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আপনি এখানে কীভাবে এলেন? আপনাকে ওরা চিড়িয়াখানায় বন্দী করেনি?’
বাঘমামা বলল, ‘না। বুদ্ধিমান ছোট্ট বন্ধু আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তোমাকে এবার কে বাঁচাবে?’
বাঘমামা এক থাবায় উড়িয়ে দিল শেয়ালকে। বনের বাইরে দূরে কোথায় যে শেয়ালটা পড়ল কেউ জানে না। বনের সবাই একসঙ্গে তালি দিয়ে উঠল। বাঘমামা ফিরে এসেছে, বনটা এবার বাঁচবে!
গোলপাতায় লেখা বাঘমামার চিঠি আজকে গুনগুন পেয়েছে। চিঠিতে মামা সবাইকে তাদের দারুণ সুন্দর বনটা ঘুরতে যেতে বলেছে। গুনগুন ঠিক করেছে পরের ছুটিতেই তারা বন ঘুরতে যাবে। আর সঙ্গে নিয়ে যাবে বাঘমামার ঢাকার প্রিয় খাবার কাচ্চি বিরিয়ানি।

বাবা হওয়া সহজ নয়

 পৃথিবীতে হাঁটাবাবা, ছালাবাবা, কানাবাবা, ছানাবাবা, পাগলাবাবার মতো হাজারো বাবা থাকার পরও আমি সেই ছেলেবেলা থেকে শুধু সাধারণ এক বাবা হতে চেয়েছিলাম। এর কারণও আছে। খুব অল্প বয়সেই নিজের বাবাকে দেখে বুঝেছিলাম, বাবা হওয়া মানেই বিরাট স্বাধীনতা। একে তো বাড়ির সবাইকে ধমকেধামকে দৌড়ের ওপর রাখা যায়, তার ওপর খেয়ালখুশিমতো বাড়ি থেকে বের হওয়া থেকে শুরু করে ইচ্ছামতো বাড়িও ফেরা যায়। কারও কিচ্ছু বলার নেই।

তাই ছেলেবেলায় কেউ যখন জানতে চাইত, ‘বলো তো হীরক, বড় হয়ে তুমি কী হবে?’ আমি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিজ্ঞানী প্রভৃতি ছকবাঁধা জবাবের ধার দিয়েও যেতাম না। সপাট বলতাম, ‘বড় হয়ে আমি বাবা হব।’

আমার উত্তরে কেউ হাসত, কেউ ধমক দিত। কিন্তু আমি লক্ষ্যচ্যুত হইনি। বাবা হওয়ার দুর্মর বাসনা নিয়েই আমি বেড়ে উঠেছি। তার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ছিল ক্লাস নাইনে। এইটের সোমাকে যেদিন প্রথম (এবং শেষ) এবং দীর্ঘ প্রেমপত্রটি লিখলাম সেদিনই, সেই চিঠির শেষ লাইনে লিখেছিলাম, ‘সত্যি বলছি সোমা, আমি আর অন্য কিছু নয়, শুধুই বাবা হতে চাই!’

সোমা আমার চিঠিটা পৌঁছে দিয়েছিল তার বড় বোনের হাতে। বড় বোন মারফত চিঠিটা যেই না সেজ ভাইয়ের হাতে পৌঁছাল, অমনি আমার পিঠে ফুটে উঠল লাল-নীল-বেগুনি দাগ। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কলেজজীবনে রুনাকে এই কথা জানালাম একটু অন্যভাবে। আশ্রয় নিলাম কবিতার। লিখলাম, ‘রুনাঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো না কো তুমি, ও তো বড় হাবা/ আমাকে সুযোগ দাও, আমি হবো ভালো এক বাবা!’

রুনার এক বড় ভাই আছে, সেই ভাই যে এসআই তা আমার জানা ছিল না। যখন জানলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। একটা পুরা রাত মা-মশাদের সঙ্গে কাটানোর পর সকালে যখন আমার বাবা আমাকে নিয়ে আসছেন, তখন ভেতরের বাবা হওয়ার আশাটা একেবারেই ম্রিয়মাণ।

কিন্তু বাবাই আবার আমার বাবা হওয়ার খেয়ালটা চাগিয়ে দিলেন। এক অবসরে তিনি আমার বিয়ে দিয়ে দিলেন। বললেন, ‘নে বাবা, এবার বাবা হবি না কাকা হবি তোর ব্যাপার!’

বাবা ছেড়ে দিলে কী হবে, আত্মীয়স্বজন তো ছাড়ে না। দেখা হলেই বলে, ‘কী, কদ্দুর? বাবা কবে হবি?’
আরে, কী মুশকিল! আমি তো ছারপোকা নই যে কিছুক্ষণের মধ্যেই বংশবিস্তার করে ফেলব! সবকিছুর একটা সময় আছে, একটা ক্ষণ আছে। আত্মীয়রা তাকিয়ে থাকে কৌতূহলে। আমি ইনিয়ে-বিনিয়ে বলি, ‘এই তো!’
ওরা বলে, ‘আরে না না, দেরি করিস না একদম। বাবা হওয়া তো সহজ কিছু না। অনেক ঝক্কি। সন্তানকে বড় করতে হবে, তার লালনপালনের দিকে লক্ষ রাখতে হবে, ভালো স্কুলে পড়াতে হবে, সব পরীক্ষায় যেন গোল্ডেন পায়, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে!’
: গোল্ডেন এ প্লাস?
: হ্যাঁ, গোল্ডেন এ প্লাস না পেলে সন্তানকে পড়িয়ে আর লাভ কী? এখন তো সবাই গোল্ডেন এ প্লাস পায়, আর তোর ছেলে পাবে না?
: ছেলে? মেয়েও তো হতে পারে।
: হতে পারে, অসুবিধা কী! ছেলে হোক মেয়ে হোক গোল্ডেন এ প্লাস কিন্তু লাগবেই লাগবে!
: আচ্ছা।
: শুধু আচ্ছা না, ভালোমতো রেডি হ। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াতে হবে।
: ইংলিশ মিডিয়ামে?
: না তো কী, বাংলা মিডিয়ামে পড়াবি ছেলেকে?
: মেয়েও তো হতে পারে।
: হোক না, আপত্তি কিসের? কিন্তু ছেলে হোক মেয়ে হোক ইংলিশ মিডিয়াম কিন্তু লাগবেই লাগবে!
: আচ্ছা আচ্ছা।
: আচ্ছা আচ্ছা কী? তোর ইংরেজি খুবই পুওর। এখন থেকেই ইংরেজি পড়া শুরু কর, না হলে তোর বাচ্চার সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে পারবি না। বাচ্চা তোকে মূর্খ বলবে। সন্তান তোকে মূর্খ বললে শুনতে ভালো লাগবে?
: না।
আমি পরের দিনই ২৭দিনেইংরেজিশিক্ষাবইটা কিনে নিয়ে এলাম। মনে মনে বললাম, ‘বাবা হওয়া দেখছি সহজ বিষয় না!’
আর ওদিকে ২৭ দিনে ইংরেজি শেখার আগেই সুখবরটা চলে এল। ডাক্তার আমার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, ‘আপনি তো বাবা হতে চলেছেন!’
ডাক্তারের ফিসফিসানি দেখে আমি ভড়কে গেলাম। আমি বাবা হতে চলেছি নাকি আমার ফাঁসি হতে চলেছে? আমি বললাম, ‘জি, এটা তো খুশির খবর।’
ডাক্তার ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘বাবা হতে যাচ্ছেন, এটার মানে জানেন তো? এখন থেকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হবে আপনাকে। এটা ফাঁসির চেয়ে কম কী?’
: আচ্ছা।
: আর সব সময় স্ত্রীর টেক কেয়ার করবেন।
: জি, নিশ্চয়ই করব।
: তার খাওয়ার প্রতি নজর রাখবেন!
: জি জি, রাখব।
: আর তার সঙ্গে একদম ঝগড়া করবেন না, বুঝতে পেরেছেন?

সবই ঠিক ছিল, কিন্তু বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া না করে থাকাটা হয়ে পড়ল খুব মুশকিলের। সারা সপ্তাহ অফিস করে সপ্তাহান্তে বউয়ের সঙ্গে একটু ঝগড়াই তো ছিল আমার একমাত্র বিনোদন। এই বিনোদনে ব্যাপক টান পড়ল। বউ আর আমার কথোপকথন হতে থাকল এই রকম-
বউ: তুমি একটা দায়িত্ব–কর্তব্যহীন উজবুক!
আমি: ঠিকই তো। আমারও নিজেকে এমনই মনে হয়।
বউ: তোমার চেয়ে গাধারাও জ্ঞানী।
আমি: আলবত। আমার তুলনায় গাধা হলো জ্ঞানতাপস।
কিছুদিনের মধ্যে বউও প্রতিবাদহীন গোবেচারা আমাকে আর মেনে নিতে পারল না। কেমন ভেজিটেবল মার্কা হয়ে গেল আমাদের কথাবার্তা।
: খেয়েছ?
: হুম।
: ওষুধ খেয়েছ?
: হুম।
: আচ্ছা, ঘুমিয়ে পড়ো।
: আচ্ছা।
এই নিরুত্তেজনার জীবনে সাময়িক উত্তেজনা হিসেবে এল অনাগত সন্তানের নামকরণ।সোনামণিদের১০১টিসুন্দরনাম বইটা নিয়ে দেখা করতে এল কয়েকজন বন্ধুবান্ধব। বউকে দেখলাম সে অনলাইনে নাম খুঁজে চলেছে। আমি বললাম, ছেলে হলে তীব্র, মেয়ে হলে তুলতুল। বউ সপাটে ‘না’ করে দিল। এই নিয়ে অনেক দিন পর একটু ঝগড়াও হলো। মনে একটু প্রশান্তি নিয়ে সে রাতে ঘুমাতে গেলাম।
নির্দিষ্ট দিনে আমি বাবা হওয়ার অপেক্ষা করতে থাকলাম ওটির সামনে। নাটক-সিনেমায় যেমন দেখেছি তেমন করে পায়চারি করতে লাগলাম। হাত কামড়ানো, পা কামড়ানো অবস্থা। তখন এক বন্ধু এসে বলল, ‘ভয় পাস না, নবজাতকদের স্মৃতি থাকে না। তোকে দেখে নিতান্তই যে উদ্বাস্তুর মতো লাগছে, তা তোর সন্তান কোনোভাবেই মনে রাখতে পারবে না!’
তারপরও হাত দিয়ে মাথার চুলটা যেই ঠিক করতে যাব অমনি দরজা খুলে গেল। নার্স আমার কোলে সদ্যোজাত মেয়েটিকে দিতেই আমি মনে মনে বলতে গেলাম, ‘আমি পাইলাম। আমি ইহাকে পাইলাম।’ কিন্তু তার অাগেই মেয়ে কাঁদতে শুরু করল। আত্মীয়স্বজন ছুটে এল। ‘সর সর, ছাড় ছাড়! কেমন বাবা হয়েছিস? মেয়েটাকে কোলেও নিতে পারছিস না?’
আমি দেখলাম আমার মেয়ে অন্যদের কোলে দিব্যি খুশ হালে আছে। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, বরং শুরু। এরপর যখনই মেয়েকে কোলে নিতে চাই, মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে চোখমুখ কুঁচকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। আত্মীয়স্বজনের ধমকের মুখে পড়ি। তারা বলে, ‘কেমন বাবা তুই? মেয়েটাকে কাঁদাচ্ছিস কেন? তুই তো দেখছি এখনো বাবাই হতে পারলি না!’
সত্যি, মেয়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখনো বোধ হয় বাবা হতে পারিনি। কিন্তু আমিও লেগে আছি, হাল ছাড়িনি। বাবার কসম, বাবা আমি হবই!

শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

বসন্ত এসে গেছে

আঁকা: সাদমান মুন্তাসিররাইসা বলল, ‘আমি শাড়ি পরে আসব, তুমি?’
ফাস্টফুডের দোকানে এসি চলছে। এসির আরামে আমার ঘুম চলে আসছে। ঝিমুনির মধ্যেই বললাম, ‘অ্যাঁ?’
: আরে, কী পরবা তুমি?
: কী পরব?
: কালকে পয়লা ফাগুন না! বসন্ত বসন্ত…পরবা না কিছু স্পেশাল?
: হুম।
: কী হুম? একটা পাঞ্জাবি পরবা, বুঝতে পেরেছ?
: আচ্ছা।
: হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরবা কিন্তু।
: ঠিক আছে।
রাইসা হেসে চলে গেল। কিন্তু বিপদে ফেলে গেল আমাকে। আমার কোনো হলুদ পাঞ্জাবি নেই। রাতুলের আছে। দিলাম রাতুলের মেসে হানা।
: তোর না একটা হলুদ পাঞ্জাবি ছিল?
: কী বলিস, কবে?
: কবে মানে? তোর না এক্স জিএফ গিফট করছিল লাস্ট বসন্তে!
: কে, মিলা?
: হ্যাঁ হ্যাঁ, মিলা। তোর ওই জিএফ হিমুর হেবি ফ্যান ছিল, তোকে একটা পকেট ছাড়া হলুদ পাঞ্জাবি দিছিল না?
: তাই তো দোস্ত! কিন্তু পাঞ্জাবিটা কই? আমি তো এইখানেই রাখছিলাম!
‘এইখানে’ বলতে রাতুল যেটা দেখাল সেটা দেয়াল ধরে কাপড়ের ভারে কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকা আধভাঙা একটা আলনা। তাতে রাজ্যের কাপড় স্তূপ হয়ে কেওক্রাডং হয়ে আছে। আমরা কেওক্রাডং বিজয়ের আশায় তিন ঘণ্টা খাটলাম। তাতে অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস বেরিয়ে এল—দুটি নতুন কিন্তু ধুলামাখা ফুলহাতা শার্ট, তিনটা অব্যবহৃত স্যান্ডো গেঞ্জি আর একটা টাই। টাইটা পেয়ে রাতুল আবেগে অস্থির হয়ে পড়ল। প্রথম চাকরির ইন্টারভিউয়ে যাওয়ার জন্য নাকি রাতুলের এক্সেরও আগের এক্স রুনা টাইটা তাকে গিফট করেছিল। কিন্তু সময়মতো খুঁজে না পাওয়ায় সেটা পরা হয়নি। আর সে কারণেই নাকি রুনার সঙ্গে ব্রেকআপ হয়েছিল। টাইটা হাতে নিয়েই রাতুল ফোন দিল কাউকে। বলল, ‘রুনা, বাবু, আমি না তোমার সেই টাইটা খুঁজে পেয়েছি। চলো না বাবু, কালকে বসন্তে দেখা করি!’
ওদিক থেকে রুনা কী বলল কে জানে, রাতুল ‘ইয়াহু’ বলে লাফ দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘থ্যাঙ্কস বন্ধু, থ্যাঙ্কস! পয়লা ফাগুনে আমাকে আর সিঙ্গেল থাকতে হবে না!’
রাতুলের আনন্দ দেখে খুশি হওয়ার বদলে আমার ভীষণ মেজাজ খারাপ হলো। বললাম, ‘কোথায় কোথায় তুই জামাকাপড় রাখিস, জানিস না? তোর হলুদ পাঞ্জাবিটা না পেলে রাইসার সাথে দেখা করতে যেতে পারব না! বুঝতে পারছিস?’
: দোস্ত, কোনো চিন্তা করিস না! তোর জন্য আমার ভাঙা প্রেম জোড়া লাগতে যাচ্ছে, আর তুই একটা হলুদ পাঞ্জাবির জন্য টেনশনে থাকবি? তোকে আজকেই আমি হলুদ পাঞ্জাবি গিফট করব। চল!
ঢাকা শহরে মানুষ ও মার্কেটের অভাব নেই। হাতের কাছে যে মার্কেট পেলাম তাতেই ঢুকে গেলাম। কিন্তু কোথাও হলুদ পাঞ্জাবি নেই। পরের মার্কেট—হলুদ পাঞ্জাবি—নেই। তার পরেরটাতেও নেই। পাঁচ ঘণ্টা চষে বেরিয়ে আমাদের চেহারা হলুদ হয়ে গেল, কিন্তু হলুদ পাঞ্জাবি আর পাওয়া গেল না। দোকানিদের এককথা, ‘গতকালকেও ছিল, কিন্তু সব শেষ। বসন্ত বলে সবাই হলুদ পাঞ্জাবি ডাবল দামে কিনে নিয়ে গেছে।’
হঠাৎ রাইসা ইনবক্সে নক করল। তাতে হলুদ শাড়ির দুটি ছবি। ও লিখেছে, ‘বলো তো কোনটা পরব?’ আমি লিখলাম, ‘পার্থক্য কী? দুইটাই তো হলুদ!’
: দুইটা হলুদ মানে? দেখতে পাচ্ছ না, একটা রানি হলুদ আরেকটা…
: আরেকটা রাজা হলুদ?
: থাক! তোমাকে আর বলতে হবে না! শোনো, তোমার পাঞ্জাবির ছবি পাঠাও, ওটার সাথে যে শাড়িটা বেশি ম্যাচ করবে সেটা পরব, ঠিক আছে?
আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি লিখলাম, ‘আরে আরে, শোনো না! আমি তো এখনো বাইরে। আর পাঞ্জাবি তো বাসায়। বাসায় গিয়ে পাঠাই?’
: অবশ্যই পাঠাবে কিন্তু। তোমার পাঞ্জাবি দেখে আমার শাড়ি ঠিক করব। তারপর সেই শাড়ি বুঝে ব্লাউজ, টিপ, নেইলপলিশ, স্যান্ডেল, চুড়ি, আইশ্যাডো সব ঠিক করব! বুঝেছ?
আমি রাতুলের দিকে তাকালাম। রাতুল বলল, ‘দোস্ত, আইডিয়া!’
: কী?
: ফটোশপ!
: মানে?
রাতুল গুগলে সার্চ দিয়ে খুঁজে খুঁজে বের করল হলুদ পাঞ্জাবির ছবি। সেই ছবিটা কেটে আমার ঘরের বিছানার ছবির ওপর সেঁটে দিলো। বলল, ‘কী? বোঝা যাচ্ছে কিছু?’
আমি সঙ্গে সঙ্গে ছবিটা পাঠিয়ে দিলাম রাইসাকে। ওদিক থেকে এল লাভের ইমোটিকন। তারপর নীরবতা। বুঝলাম, রাইসা ঝঁাপিয়ে পড়েছে তার ম্যাচিং নিয়ে। কিন্তু আমার কী হবে? হলুদ পাঞ্জাবি ছাড়া কালকে রাইসাকে মুখ দেখাব কী করে?
এবারও উদ্ধারকর্তা রাতুল। বলল, ‘তোর সাদা পাঞ্জাবি আছে না?’
: আছে।
: ব্যস! তাইলে তো হয়েই গেছে!
: কী?
: চল রং কিনি!
রং কিনে আমরা যখন বাসায় ফিরলাম তখন রাত বারোটার মতো বাজে। ফেসবুকে বসন্ত নিয়ে হাউকাউ শুরু হয়ে গেছে। অথচ আমাদের চলছে রং নিয়ে ভংচং। মেঝেতে সাদা পাঞ্জাবির ওপর করে চলেছি হলুদ রং। সেই রং লাগছে আমাদের শরীরেও। আর রংগুলো উঠছে না দেখে খুব খুশি রাতুল। বলছে খুব পাকা রং, ওঠার কোনো চান্স নাই! বৃষ্টি হলেও নাই!
: বসন্তে বৃষ্টি হবে ক্যান?
: আবহাওয়ার কোনো গ্যারান্টি আছে? ওয়েদার এখন মেন্টাল কেস! দেখ না কী সুন্দর হয়েছে তোর হলুদ পাঞ্জাবি!
আমি তাকিয়ে দেখলাম। আসলেই খুব খারাপ হয়নি। পাঞ্জাবি শুকাতে দিয়ে ঘুমাতে গেলাম। ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখলাম, আমি আর রাইসা দুজনে পয়লা ফাগুনে হাত ধরাধরি করে হাঁটছি। রাইসার পরনে হলুদ পাঞ্জাবি আর আমার পরনে হলুদ শাড়ি। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি, রাইসার পাঞ্জাবি থেকে গলগল করে রং উঠে যাচ্ছে। রাইসা চিৎকার করে বলছে, ‘ফ্রড! তুমি একটা ফ্রড!’
ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠলাম আমি। ভীষণ মাথাব্যথা। চোখেও মনে হচ্ছে ঝাপসা দেখছি। ব্রাশ করতে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে আঁতকে উঠলাম। চোখ আগুনের মতো লাল। আর মুখভর্তি ঘামাচি। এত ঘামাচি কোনোকালে আমার উঠেছিল কি না সন্দেহ! পরক্ষণেই বুঝলাম, এগুলো ঘামাচি না, বসন্ত! গুটিবসন্ত। ওদিকে রাইসার ফোন, ‘হ্যালো, শুভ বসন্ত, হীরক!’
আমি বললাম, ‘শুভ গুটি বসন্ত, রাইসা!’

পুট্টুস নামের কুট্টুসটা

অলংকরণ: তুলি
তার মানে তোমরা বলছ কুট্টুসদের তোমরা চেনো না? দেখোইনি কোনো দিন? আরে বাবা, এই তো সেদিনই আমার সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে গেল। আমাকে দেখেই ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে খিলখিল করে পেট চেপে হাসতে শুরু করল। 
আচ্ছা শোনো, বাড়ি থেকে বেরিয়ে কু-ঝিকঝিক ট্রেনে চেপে তোমরা যদি ঠিক ঠিক যেকোনো একটা দিকে নামতে পারো, আর নেমেই যদি যেতে পারো এক শ বাইশ কিলোমিটার, আর যেতে যেতেই যদি সন্ধ্যা হয়ে আসে, আর সন্ধ্যা হলেই যদি সূর্যটা ডুবতে শুরু করে, আর যেখানে সূর্য ডোবে ডোবে সেখানে যদি উঁচু একটা টিলা মতন থাকে, তখন তুমি শুধু ওই টিলার ওপর দাঁড়িয়ে দেখো-কী হয়!
যেই না ডুববে সূর্যটা, অমনি চলে আসবে কুট্টুসেরা। তোমাদের যে পুতুলগুলো আছে, কুট্টুসেরা তার চেয়ে এই একটু হয়তো বড়। মানুষের মতোই মাথা আর শরীর। মাথার ভেতর চোখ-মুখ সবই আছে, শুধু নাক নেই। কুট্টুসগুলো তাই কোনো কিছুর গন্ধ পায় না।
আর জানো তো কট্টুসগুলোর একটা করে চিকন চিকন লেজও আছে! চিকন, কিন্তু কী যে শক্ত! কুট্টুসগুলো তো কখনো কখনো ওই লেজের ভরেই দৌড়ায়। আবার কখনো কখনো গাছের সঙ্গে লেজটা লেপটে সিলিং ফ্যানের মতো বনবন করে ঘোরে। অনেকক্ষণ ঘোরা হলে ধপ ধপ করে মাটিতে ছিটকে পড়ে আর তখন তারা ঠিকমতো হাঁটতেও পারে না। টলতে টলতে চলতে চলতে ওরা তখন খিলখিল করে হাসে। কুট্টুসগুলো কিছু হলেই হাসে। সারা বছর হাসে!
আচ্ছা, তোমরা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করছ না আমার কথা! ভাবছ আমি কার কাছ থেকে জানলাম এত সব! আরে, পুট্টুসের সঙ্গে যে আমার বন্ধুত্ব। এখন আবার বোলো না যে পুট্টুস কে? পুট্টুস হলো কুট্টুসদের মধ্যে সবচেয়ে দুষ্টু। আমি যেদিন প্রথমবার গেলাম কুট্টুসদের কাছে সেদিনই পুট্টুস লেজের সাহায্যে তিড়িং করে লাফিয়ে বিড়িং করে আমার ঘাড়ে উঠে বসল। বসেই বলল, ‘হ্যাল্লো! আমি হলাম পুট্টুস! তুমি কে?’
আমি যে-ই না আমার নাম বলতে যাব অমনি পুট্টুস বলল, ‘থাক থাক। তোমার আর নাম বলতে হবে না। তুমি গল্প জানো?’
আমি রাগের স্বরে বললাম, না।
পুট্টুস বলল, জানো না? গল্প না জানলে তুমি এখান থেকে যাবে কীভাবে?
: মানে?
: মানে…কুট্টুসদের কাছ থেকে যেতে গেলে তাদের গল্প শোনাতে হবে।
পুট্টুসের সঙ্গে অন্য কুট্টুসগুলো তখন খিলখিল করে হেসে উঠল। আর মুখে বলল, ঠিক ঠিক!
আমি পড়লাম মহাবিপদে। ভাবলাম পুট্টুস তো পিচ্চি, তাকে একটা পুরোনো গল্প শুনিয়ে দিই। শুরু করলাম ডালিমকুমারের গল্প। পুট্টুস বলল, উহহু, এই গল্প তো পুরোনো। নতুন কোনো গল্প বলো…
: একটা ছিল জাদুর চেরাগ…
: ধুর! এটাও পুরোনো। চেরাগের ভেতর থাকে জিন। নতুন কোনো গল্প বলো না…!
: এক ছিল ব্যাঙ আর রাজকন্যা…!
: থামো থামো। কী সব পুরোনো গল্প বলছ তুমি?
: তোমরা তো সব গল্পই জানো। আর তাহলে নতুন গল্প কোথায় পাব?
: যতক্ষণ নতুন গল্প না শোনাতে পারবে, ততক্ষণ কোথাও যেতে পারবে না তুমি! 
ভয়ংকর বিপদ। আমি তো আর তোমাদের মতো না যে ধুমধাম করে গল্প বানিয়ে ফেলব! কিন্তু নতুন গল্প না বলতে পারলে তো এরা যেতেও দেবে না। তাই অনেক চিন্তা করে বললাম, এক দেশে ছিল এক পুট্টুস!
পুট্টুস লেজ নাড়িয়ে বলল, রাজা না রানি না, দৈত্য না ভূত না…এক দেশে ছিল এক পুট্টুস? দারুণ তো। নতুন নতুন মনে হচ্ছে। বলো, তারপরে বলো…
আমি বললাম, পুট্টুসটা ছিল ভীষণ চঞ্চল আর ভারী দুষ্টু!
: ও তাই নাকি? বাহ! দুষ্ট পুট্টুসের গল্প?
: সে শুধু সবার কাছে গল্প শুনতে চাইত!
: তাই নাকি? তারপর?
আমি কু-ঝিকঝিক ট্রেনে চেপে কী করে কুট্টুসদের সঙ্গে দেখা করলাম তা বলতে থাকলাম। কী করে পুট্টুস আমার ঘাড়ে উঠে আমার গল্প শুনতে শুরু করল সেটাও বলতে থাকলাম। পুট্টুস গল্প শুনতে শুনতে বলতে থাকল, বাহ্! দারুণ! দারুণ! খুবই নতুন গল্প! এমন গল্প আগে কখনো শুনিনি।
পুট্টুসকে পুট্টুসের গল্প শুনিয়ে সেদিন আমি বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। আজকে খবর পেলাম পুট্টুস নাকি তাদের সঙ্গী-সাথি নিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণে বেরিয়েছে। সবার বাড়িতে ঢুকে ঢুকে নাকি বলছে, ‘হ্যাল্লো, আমার নাম পুট্টুস। তুমি কি গল্প জানো? নতুন কোনো গল্প?’
আচ্ছা, তোমাদের কাছে নতুন গল্প আছে তো? পুট্টুস তো তোমাদের বাড়িতেও আসতে পারে, তাই না?

আমরা 'ভাগ্যবান' দুর্ভাগা

গল্প ১
মাসুদ রানার হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম
গোপন এক মিশন নিয়ে সেই সকাল থেকে মাসুদ রানা বসে আছে কারওয়ান বাজারে। তার চওড়া কপালে তিন-চারটা ব্রণ, যার একটা এরই মধ্যে পেকেও গেছে। ব্যথা হচ্ছে অল্প অল্প। রানা বুঝতে পারছে না ব্রণটায় খোঁটাখুঁটি করা ঠিক হবে কি না। কারণ, সে এখন রয়েছে বিশেষ একটা অ্যাসাইনমেন্টে।
গত রাতেই জরুরি খবর দিয়ে মতিঝিল অফিসে ডাকা হয়েছিল তাকে। আর গিয়েই চক্ষু চড়কগাছ রানার। রাহাত খানের নাকের নিচে ঝুলছে এক অতিকায় গোঁফ। কাঁচা-পাকা ভ্রুজোড়াও আর নেই, তাতে কলপের কালি। গুনগুন করে গান গাইছেন রাহাত খান, ‘ঘরেতে ভ্রমর এল গুনগুনিয়ে…’।
নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না রানা। এ কী দেখছে, এ কী শুনছে সে! রাহাত খান একটা ফাইল এগিয়ে দিলেন রানার দিকে। ফাইলের রং লাল। ওপরে বড় বড় করে লেখা, ‘টপ সিক্রেট!’
ফাইলটা খুলতেই রানা দেখল, এক তরুণীর ছবি। অনিন্দ্যসুন্দরী। চোখে-মুখে জাদু। রানা দেখল, রাহাত খানের মুখে লজ্জা মেশানো হাসি! মানে কী এসবের?
রাহাত খান বললেন, ‘নিচে একটা চিঠি আছে। প্রতি সকালে ও কারওয়ান বাজারে সবজি কিনতে আসে। চিঠিটা তাকে পৌঁছে দিতে হবে, বুঝেছ?’
রানা চাকরি বাঁচানোর ভয়ে আর কিছু বলল না। ফাইলটা বন্ধ করে রেখে দিল নিজের কাছে। বেরিয়ে যাচ্ছিল রানা। ডাক দিলেন রাহাত খান, ‘রানা! সাবধান! এ আমার জীবন-মরণের প্রশ্ন!’
: জি, অবশ্যই!
: আর শোনো, কয়েকটা নীল পদ্মও নিয়ে যেয়ো। আজকালকার জেনারেশন তো, আমি এসব ঠিক বুঝেও উঠতে পারি না...বোঝোই তো! তোমরাই ভরসা!
: কোনো চিন্তা করবেন না, স্যার!
রানা এখন কারওয়ান বাজারে অপেক্ষা করছে কপালে ব্রণের ব্যথা আর গোপন মিশনের উৎকণ্ঠা নিয়ে। তার হাত পেছনে লুকানো। কারণ, সে হাতে দুলছে কয়েকটি নীল পদ্ম।
.গল্প ২
আজ মিসির আলীর বিয়ে
কাজী বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! এবার বর বাবাজি, উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দিন।’
মিসির আলী উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দিতে গেলেন। কিন্তু দিতে গিয়ে হঠাৎই তীব্র টান অনুভব করলেন পায়ের রগে। হঠাৎই ব্যথা। ব্যথাটা চিড়িক করে একেবারে মাথায় গিয়ে ঠেকল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধপাস করে পড়ে গেলেন।
মিসির আলী বুঝতে পারলেন, তিনি জ্ঞান হারাচ্ছেন। এ সময় তাঁর নিজের মানসিক অবস্থা নিয়েই ভাবনা আসার কথা, তিনি এখন এক্স ওয়াই জেড সংখ্যা ধরে অমীমাংসিত রহস্যের মীমাংসা করবেন। কিন্তু অত্যন্ত বিচলিতভাবে তিনি খেয়াল করলেন, তাঁর মাথার ভেতর এ সময় অন্য একটা মুখ ভেসে উঠছে। এই মুখ ফারিয়ার। ফারিয়াকে তিনি আজ এই কিছুক্ষণ আগে বিয়ে করেছেন! ফারিয়ার মুখের ওপর দিয়ে মিসির আলীর সব রহস্য, সব অমীমাংসা যেন নিমেষেই হারিয়ে যাচ্ছে। মিসির আলী মনে মনে বললেন, ‘হায় হায়, বউয়ের চেহারা এভাবে সামনে চলে এলে তো আমি কোনো কাজ করতে পারব না!’ তিনি মন ফেরানোর চেষ্টা করলেন। ১০০ থেকে উল্টো গণনা শুরু করলেন। ভালোই আসছিলেন। কিন্তু আটকা পড়লেন পঁচিশে। ফারিয়ার বয়স ২৫। ফারিয়া বলে ‘সুইট টোয়েন্টি ফাইভ’। ‘সুইট’ বলার সময় ফারিয়ার ঠোঁট অদ্ভুত রকমের গোল হয়। তা দেখতে কী যে ভালো লাগে! মিসির আলীর সব হিসাব তালগোল পাকিয়ে গেল। মিসির আলী বললেন, ‘হায় হায়! হায় হায়!’
জ্ঞান হারানো অবস্থাতেই মিসির আলী ফারিয়ার কণ্ঠ শুনতে পেলেন। ফারিয়া তাঁকে ডাকছে, ‘অ্যাই মিসির, মিসির! অ্যাই, ওঠো না...অ্যাই বাবুটা, ওঠো বলছি!’
মিসির আলী কী করবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি জানেন ফারিয়ার এই ডাকে সাড়া দিলে তাঁর জীবনের বাকি রহস্যগুলো চিরকাল অমীমাংসিতই থেকে যাবে। কিন্তু তারপরও এই ডাক উপেক্ষা করার শক্তি তিনি অনুভব করছেন না। ফারিয়া ডেকেই যাচ্ছে, ‘মিসির, অ্যাই মিসির, বাবু আমার, ওঠো...।’
গল্প ৩

বিদায় হিমু
খালু হুংকার দিয়ে বললেন, ‘বিদায় হিমু, বিদায়!’
খালুর হাতে চকচকে ল্যুগার। হিমু একটা ঢোক গিলল। বিপদের সময় বাদলই হোক আর রূপাই হোক, কারও কোনো খবর পাওয়া যায় না। যা করার এখন নিজেকেই করতে হবে। হিমুর পরনে পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রং মেরুন। মেরুন রঙের পাঞ্জাবিটাতে পাঁচটা পকেট। দুইটা বাইরে আর তিনটা ভেতরে। ভেতরের একটা পকেটে তার প্রিয় ওয়ালথার পিপিকেটা নাক গুঁজে আছে। সেটা একবার বের করতে পারলেই...!
হিমু তার হাতটা পাঞ্জাবির পকেটের ভেতরে নিয়ে যেতেই খালু চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘উঁহু,  চুপ করে ডেরিয়ে থাকো! নড়েছ কি মরেছ!’
‘খাইছে!’ বলে উঠল হিমু। এবার তাহলে কী করা যায়? খালুর হাতটা তিরতির করে কাঁপছে। যেকোনো সময় ঠাস করে গুলি বেরিয়ে যাবে। তাহলে খালুর বাড়ি থেকে এত টাকাপয়সা চুরি করে আর লাভই–বা     কী হবে?
‘না হিমু, আরও কত কত দিন তোমাকে বাঁচতে হবে! কত রকমভাবে ভোগ করতে হবে জীবনটা।’ মনে মনে ভাবে সে। বাবা ডায়েরি ভর্তি যতই উপদেশবাণী লিখে যাক, যতই বলুক, ‘বাবা হিমালয়, পৃথিবীকে তুমি সমান দুই ভাগে বিভক্ত করিতে পারো। এক ভাগ ভোগ আর এক ভাগ যোগ। তুমি এই দুইটির কোনোটিতেই প্রবেশ করিবে না। তোমাকে চলিতে হবে তিন নম্বর পথে...।’
‘হুহ্! তিন নম্বর পথ! আমি ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা নাকি?’
খালু এগিয়ে আসছেন। না, আর অপেক্ষা করা যায় না। হিমু তীব্র বেগে লাফিয়ে পড়ল সামনে। এক লহমায় মেরুন পাঞ্জাবির ভেতর থেকে তার হাতে উঠে এল ওয়ালথার পিপিকে। এবার খালু আর হিমু মুখোমুখি। দুজনের হাতেই শোভা পাচ্ছে দুটি পিস্তল। গুলি ছুটবে যেকোনো সময়...!
পাদটীকা: আমরা সৌভাগ্যবান! আমরা জানি, ওপরের গল্পগুলো ভুল। কিন্তু আমাদের শিশুরা দুর্ভাগা! তারা জানেও না, তাদের পাঠ্যপুস্তকে কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক!

বইমেলায় পুলিশ

রস+আলো রিমান্ডে
রস+আলোর পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, শুরু হয়ে গেছে আমাদের সবার প্রিয় একুশে বইমেলা। আপনারা নিশ্চয়ই এ-ও জানেন যে এবারের বইমেলার বই পুলিশও পড়ে দেখবে। কোথাও কোনো অসংগতি আছে কি না, তা বোঝার জন্য। কিন্তু আপনারা নিশ্চয়ই এটা জানেন না যে বই পড়তে আমাদের পুলিশদের কেমন লাগছে! রস+আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে সেসব অজানা তথ্য। জানাচ্ছেনআহমেদ খান: বইমেলার শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?
: খুব প্রেশারে আছি, ভাই।
: বুঝতেই পারছি। জননিরাপত্তামূলক কাজ করেন আপনারা, প্রেশার তো একটু বেশি থাকবেই।
: আরে নাহ্‌! সেসব তো গা-সওয়া হয়ে গেছে। এখন যোগ হইছে নতুন প্রেশার—বই পড়া!
: বই পড়তে ভালো লাগছে না?
: সব বই কি আর পড়া যায়, বলেন? গতকালকে পড়তে হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অধিবিদ্যার ফলাফল। সাড়ে তিন শ পৃষ্ঠার বই। সব কথা গেল টুপির ওপর দিয়ে! দাঁত যে এখনো মাড়িতে আছে, সেইটা ছোটবেলায় নিমের দাঁতন ব্যবহার করার ফল!
: আর কী পড়েছেন?
বাস্তুতত্ত্ব পড়লাম। বিরাট বিজ্ঞান। ঘরের আসবাবপত্র কীভাবে রাখতে হয়, জানাই ছিল না এদ্দিন। বইয়ের সেই জ্ঞান বাসায় ফলাতে গিয়ে অবশ্য ধরা খাইছি! যেই না বাসার খাট চেঞ্জ করা ধরছি, বউয়ে দিছে কড়া ধমক। বলেছে, আমি নাকি অল্পবিদ্যা ভয়ংকরি, কথায় কথায় পালঙ্ক ধরি!
: আপনি কী বললেন?
: আমি আর কী বলব, একটা বই ধরায়ে দিছি তারও হাতে। বলেছি, আমার হয়ে তুমিই বুক রিভিউ করে দাও এইটার।
: কী বই?
: অক্সফোর্ড ডিকশনারি, এই রকম মোটা। সাত দিন অন্তত চুপ থাকবে! এর মধ্যেই ১১টা বাজে ও উসকানিমূলক শব্দ বাইর করে ফেলছে! এইগুলা নিয়ে টিম মিটিংয়ে বসব অতি দ্রুত।
: তাহলে অক্সফোর্ড ডিকশনারি বাতিল হয়ে যাবে নাকি?
: বলা তো যায় না কিছু। এইটা নির্ভর করতেছে অনেক কিছুর ওপর। অত সহজে তো আমরা ছাইড়া দিতে পারি না।
: তা তো ঠিকই। তা আজকে কিছু পড়ছেন না?
: পড়ব না আবার? এইটাই তো চাকরি! আজ পড়ছি তরুণ কবির কবিতার বই ঘটি নিয়ে লটঘট। নামের মধ্যেই একটা বেয়াড়া রকমের উসকানি আছে। কিন্তু উসকানিটা ঠিক কোথায়, ধরতে পারতেছি না। উসকানিটা ধরতে পারলেই কবিরে ধরব! তার লটঘট তখন চটপট চম্পট দিবে!
: বাহ্‌! আপনি তো দেখছি এর মধ্যেই ছন্দে ছন্দে কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন!
: বই খুবই ভয়ংকর জিনিস রে ভাই। খুবই প্রভাবিত কইরা ফেলে! জানেন না আমাদের কমিশনার স্যারের কাহিনি?
: না তো। কী হয়েছে তাঁর?
: স্যারের মাথায় অল্পবিস্তর ছিট দেখা দিয়েছে!
: বলেন কী?
: হুম। এই ছিটের নাম হিমু ছিট। হ‌ুমায়ূন আহমেদ বলে এক রাইটার আছেন, সেই রাইটারের একটা ক্যারেক্টার আছে হিমু। জানেন আপনি?
: জি, জানি।
: কমিশনার স্যার জানতেন না। না জানলেই বোধ হয় ভালো হইতো।
: কেন?
: আমাদের বস এক রাত্রে হিমুর সাত-সাতটা বই পইড়া ফেলছেন। তারপর কাউকে কিছু না বইলা নদীর পাড়ে মাটি খুঁড়ে গর্ত করে সেই গর্তের ভেতর ঢুকে বসে আছেন। শুধু মাথাটা বাইরে। প্রকৃতির সাথে নাকি থাকতে চান। আমি ভাবতেছি, উনি প্রকৃতির সাথে আছেন ভালো কথা, কিন্তু এর মধ্যে যদি প্রকৃতির ডাক আসে, তাইলে তখন কেমনে কী?
: তাই তো! তখন তো ঘটি নিয়ে লটঘট করারও উপায় নাই!
: একদম না। আমরা সবাই মিলে স্যারকে ওঠাতে গেছিলাম মাটি থেকে।
: উঠেছেন?
: না। হিমুর আরও বই চাইতেছেন। ওদিকে আরেকজনও নাকি হিমু অ্যাফেক্টেড হইছে। পুলিশের ইউনিফর্ম পইরা খালি পায়ে নাকি ঘুরতেছে। বলেন, কেমনে কাজ চলবে?
: সত্যিই মুশকিল!
: আরও মুশকিল আছে! ধরেন নজরুল তাঁর সাম্যবাদী কবিতায় লিখছেন, ‘বন্ধু, যা খুশি হও,/ পেটে পিঠে কাঁধে মগজে যা খুশি পুঁথি ও কেতাব বও...’—এই রকম আরও অনেক অনেক লাইন এই দুখু মিয়ার আছে। দুখু মিয়া লেইখা গেছেন আর দুঃখে পড়ছি আমরা!
: কেন, দুঃখ কেন?
: দুঃখ না? ধরেন কাজী নজরুল ইসলামের লেখার ভেতর তো উসকানির শেষ নাই! এখন বলেন, নজরুল ইসলামকেও কি ব্যান করব আমরা? বলেন, সিদ্ধান্ত দেন?
: না না, এইটা তো আপনাদের সিদ্ধান্ত। আপনারা কী বলেন?
: আমরা আর কী বলব? ছোটবেলা থেইকা পড়াশোনা কইরা পুলিশে ভর্তি তো হইছিলাম যেন আর পড়াশোনা করতে না হয়! আর এখন দেখেন, নতুন কইরা আবার পড়াশোনা! কদ্দুর আর ভাল্লাগে কন? একটু পরেই একটা গবেষণাগ্রন্থ পড়তে হবে। নাম শুনবেন? বিলুপ্তপ্রায় পান্ডা ও সবুজ কচি বাঁশ! বলেন, এই বই পড়তে কেমন লাগার কথা?
: ইন্টারেস্টিং হতে পারে। বাঁশ, পান্ডা, গুন্ডা—এগুলো তো আপনাদের জন্য ইন্টারেস্টিং হওয়ার কথা!
: ইন্টারেস্টিং না? দাঁড়ান এইখানে, এই যে নেন বইটা, পড়েন। পইড়া আমারে রিভিউ দেন। এই বইয়ের মধ্যে কোনো উসকানি আছে কি না দেখেন, পড়েন!
: না না, কী বলেন এই সব! শোনেন, আমার কথা শোনেন...
: কোনো শোনাশুনি নাই! দাঁড়ায় দাঁড়ায় চুপচাপ বইটা শেষ করেন!
: ভাই শোনেন, মামা...
: রাখেন আপনারা মামা! এই, কে আছিস, একটা দড়ি নিয়ে আয়! আইজকা রিপোর্টাররে বাইন্ধা এইখানেই বই পড়ামু! আরও ১০টা বই নিয়া আয়। মোটা মোটা বই নিয়া আয়...

পাদটীকা: এরপর কী হয়েছে, তা আর জানার চেষ্টা করবেন না। আমরা সেসব প্রকাশে অক্ষম।